নতুন ব্যাক্টেরিয়া আবিষ্কারে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ

0
181

30সিলেটের সংবাদ ডটকম ডেস্ক: বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দরবারে পরিচয় পেয়েছে সুফলা-সুজলা, শস্য-শ্যামলা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি দেশ হিসেবে। বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে নতুন অর্জনের মধ্য দিয়ে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে জানান দিচ্ছে নিজের অবস্থান। এ অর্জনের তালিকায় যুক্ত হয়েছে মসুর গাছের শিকড়ে নডিউল সৃষ্টিকারী নতুন জাতের ব্যাক্টেরিয়া আবিষ্কার ও নামকরণ।

ফলে বিশ্বদরবারে নতুন পরিচয় পেয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ কৃষি পরমাণু গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা): সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. হারুন-অর রশীদ বাংলাদেশের মসুর গাছের শিকড়ে গুটি বা নডিউল সৃষ্টিকারী তিনটি নতুন প্রজাতির ব্যাক্টেরিয়া আবিষ্কার ও নামকরণ করে দেশের জন্য সুনাম বয়ে এনেছেন।

তিনি বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মসুর গাছের শিকড়ের নডিউল নিয়ে দীর্ঘ ছয় বছর গবেষণা করে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নতুন প্রজাতির ব্যাক্টেরিয়া শনাক্ত করেন। পরে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসারে বাংলাদেশের নাম ব্যবহার করে ওই ব্যাক্টেরিয়ার বৈজ্ঞানিক নামকরণ করে দেশ ও জাতির জন্য এক বিরল সম্মান ও পরিচয় আনেন।

তার আবিষ্কৃত ব্যাক্টেরিয়া তিনটির নামের ক্ষেত্রে একটিতে দেশের নামকে প্রাধাণ্য দিয়ে Rhizobium bangladeshense®, অন্যটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নামানুসারে Rhizobium binae® এবং সর্বশেষটি মসুর ফসলের নামানুসারে  এবং Rhizobium lentis® রাখা হয়েছে।

ধারণা করা হয়, পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে মসুর জাতীয় ফসলের শিকড়ে নডিউল সৃষ্টির জন্য Rhizoobium leguminoserum ব্যাক্টেরিয়া দায়ী। কিন্তু এই ধারণা ভুল প্রমাণিত করে শুধুমাত্র বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মসুর জাতীয় ফসলের গাছের শিকড়ে নডিউল সৃষ্টিকারী তিনটি ভিন্ন ধরণের ব্যাক্টেরিয়ার অস্তিত প্রমাণ পান তিনি।

২০০৯ সালে তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মসুর জাতীয় ফসলের নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণা শুরু করেন। সংগৃহীত নমুনার ৩০টি ব্যাক্টেরিয়া থেকে সাতটি জিন সিকোয়েন্স করে বায়োইনফরমেটিক এ্যানালাইসিস, ডিএনএ ফিঙ্গার প্রিন্টসহ আরও কয়েকটি বৈশিষ্ট পরীক্ষা করেন।

প্রাথমিকভাবে সম্পন্ন করা ওই সকল পরীক্ষা থেকে তিনি বাংলাদেশের পরিবেশে মসুর ফসলের নডিউল সৃষ্টির জন্য নতুন প্রজাতির ব্যাক্টেরিয়ার উপস্থিতি লক্ষ্য করেন। তার এই গবেষণাকে আরও পাকাপোক্ত করতে জার্মানি, তুরস্ক ও সিরিয়া থেকে মসুর গাছের শিকড়ে নডিউল সৃষ্টিকারী ব্যাক্টেরিয়া সংগ্রহ করে গবেষণা করা হয়। পরবর্তীতে এই দুই জায়গার নমুনার তুলনামূলক গবেষণা থেকে প্রমাণ করেন, বাংলাদেশের মসুর গাছের যে প্রজাতি ব্যাক্টেরিয়ার অস্তিত্ব বিদ্যমান তা পৃথিবীর অন্যান্য জায়গা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

তার এই গবেষণা ফলাফল ইউরোপ থেকে প্রকাশিত মাইক্রোবায়োলজির বিখ্যাত জার্নাল ‘সিস্টেমেটিক এ্যান্ড এ্যাপ্লাইড মাইক্রোবায়োলজি’ এবং আমেরিকার বিখ্যাত জার্নাল ‘এফইএমএস মাইক্রোবায়োলজি ইকোলজি’ এ প্রকাশিত হলে দেশে-বিদেশে সাড়া পড়ে যায়। এর পর তিনি থেমে থাকেননি। ওই ব্যাক্টেরিয়া নমুনাগুলো নিয়ে ডিএনএ-ডিএনএ হাইব্রিডাইজেশন, কার্বন-নাইট্রোজেন সোর্স ইউটিলাইজেশন প্যাটার্ন, ফ্যাটি এসিড প্যাটার্ন এবং হোল জিনোম সিক্যুয়েন্স পরীক্ষাগুলো করে ব্যাক্টেরিয়ার নতুন প্রজাতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হন তিনি।

পরবর্তীতে ওই নতুন আবিষ্কৃত ব্যাক্টেরিয়া তিনটির নামকরণের জন্য আন্তর্জাতিক নিয়ম-নীতি অনুসরণ করে বৈজ্ঞানিক নামের স্বীকৃতি প্রদাণের একমাত্র জার্নাল “ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ সিস্টেমিক অ্যান্ড ইভিউলোশনারি মাইক্রোবাইলোজি” তে এই নামকরণ প্রকাশিত হয়। এর ফলে মসুর গাছের মূলে নডিউল সৃষ্টির কারণ হিসেবে দেখানো প্রায় ১০০ বছরের ধারণা থেকে সরে আসতে হচ্ছে বিজ্ঞানীদের।

ফলে বিজ্ঞানের মৌলিক এই বিষয় নিয়ে নতুনভাবে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর এই আবিষ্কার সম্পর্কে ড. হারুন-অর রশীদ বলেন, এই গবেষণাটি বিজ্ঞানের একটি মৌলিক গবেষণা। এই গবেষণায় প্রাপ্ত মৌলিক জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে প্রয়োগিক দিক নিয়ে অনেক কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। নতুন প্রজাতির এই ব্যাক্টেরিয়াগুলো উপকারী এবং এদের কোন ক্ষতিকর দিক নেই।

এই ব্যাক্টেরিয়া দিয়ে জীবাণু সার তৈরির করা হলে একদিকে যেমন মসুর গাছে ইউরিয়া সার ব্যবহার কমে যাবে, অন্যদিকে ফলনও ১০-২০% বেড়ে যাবে। এতে করে মসুর ফসলের উৎপাদন খরচ কমে যাবে। নতুন প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ার বৈজ্ঞানিক নামের সাথে “বাংলাদেশ” এবং “বিনা” এর নাম, রাইজোবিয়াম নিয়ে পৃথিবীতে যতদিন গবেষণা হবে ততদিন স্বগর্বে উচ্চারিত হবে বলে মনে করেন এই বিজ্ঞানী।

(Visited 5 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here