মুড়ারবন্দ তরফ রাজ্যের প্রথম রাজধানী ও সৈয়দ বংশের উৎসস্থল

0
1944

06সিলেটের সংবাদ ডটকম ডেস্ক: পরম করুনাময় আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে হযরত শাহ জালাল (র) ও হযরত সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপাহশালার (র:) কর্তৃক সিলেট বিজয় হয়। তারপর ১৩০৪ খ্রিষ্টাব্দে তরফ রাজ্য (বর্তমানে হবিগঞ্জ) সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন (র:) কর্তৃক বিজয় হয়।

এই জ্বেহাদে বারজন আউলিয়া সহ এক হাজার অশ্বারোহী ও তিন হাজার পদাতিক সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী অংশগ্রহন করেন বলে ইতিহাসে প্রমান পাওয়া যায়। তরফ বিজয়ের পর আচক নারায়নের রাজধানী রাজপুর (বর্তমানে গাজীপুর) থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার উত্তরে চলে আসে। হযরত সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপাহসালার (র:) পুত্র সৈয়দ সিরাজ উদ্দিন (র:) সহ কতিপয় সহচর নিয়ে খোয়াই নদীর তীরে তরফ রাজ্যের মাঝামাঝি মুড়ারবন্দ নামক স্থানে চলে আসেন এবং এখানে বসতি স্থাপন করেন এবং এখান থেকে রাজ্য শাসন করেন। 05আর শাহী সৈন্যদের ভাটির মঞ্জিলে খোয়াই নদীর তীরে যেখানে অবস্থান করতে নির্দেশ দেন পরে এ স্থানের নাম হয় লস্করপুর। এখানে লস্কররা (সৈন্য) বাস করত বলেই এই স্থানের নাম হয় লস্করপুর। লস্করপুর হাবেলী নিবাসী সৈয়দ আবদুল আগফর সাহেব “তরপের হতিহাস” গ্রন্থে লিখেন সৈয়দ মুছা উরফে লস্করের নামানুসারে লস্করপুর নামকরণ হয়।

The argument that the place where Nāṣir al-Dīn’s army (laśkar) encamped/settled came to be known as Laśkarpur is put forth by Acyutacaraṇa Caudhurī ([1910] 2009, 1: 281). Āgphar ([1887] 2008, 46) opines that Taraph’s Laśkarpur was named after Saiyad Musā, who was also known as Laśkar. It is more plausible that the capital’s name was associated with its founder, or his army encampment, rather than with Saiyad Musā, the founder’s descendant, five generations removed.0দুটি ফার্সী শব্দের মিলনে মুড়ারবন্দ দরবার শরীফের নাম গঠিত হয়। মুড়ারবন্দ গ্রামের আদি নাম ছিল মুরাদবন্দ। মুরাদ+বন্দ=মুরাদবন্দ হযরত সৈয়দ নাসির উদ্দিন (র:) নিজে এই গ্রামের নামকরণ করেন। যার অর্থ বিশ্লেষন করলে দাঁড়ায় – মুরাদ=(বি) অভিপ্রায়; অভিলাষ; আকাঙ্কা; স্পৃহা; বাসনা; ইচ্ছা। বন্দ = (ক্রি) বন্দনা করা ; আরাধনা করা; এবাদত করা।

অতএব মুরাদবন্দ শব্দের তাৎপর্যপূর্ণ অর্থ দাড়ায় অভিলাষ পূরণের জন্য এবাদতের স্থান বা আরাধনা করার স্থান। পরবর্তিতে আঞ্চলিকতার প্রভাবে মুরাদবন্দ থেকে মুড়ারবন্দ হয়েছে। মুরাদবন্দ > মুড়ারবন্দ। এটাই হচ্ছে মুড়ারবন্দ দরবার শরীফের প্রকৃত ও যুক্তিযুক্ত নামতত্ত্ব। কোন কোন লেখক মুড়ারবন্দ দরবার শরীফের নামতত্ত্বে লিখেছেন এই ভাবে “ তাই কিংবদন্তীর মতে (মুড়া অর্থ গোড়া (মূল) আর বন্দ অর্থ ক্ষেত) গোড়ার ক্ষেত সমূহই ‘মুড়ারবন্দ’।01আবার কেউ কেউ বন (জঙ্গলা) থেকে ‘বন্দ’ হয়েছে বলে মনে করেন”। আবার কেউ কেউ পৌরাণিক কাহিনীর মত মুড়াদেও নামক এক দানবের নাম থেকে মুড়ারবন্দ গ্রামের নামকরন হয়েছে বলে মনে করেন। তবে আমাদের কাছে এইগুলো যৌক্তিক মনে হয় নাই। মুড়ারবন্দ দরবার শরীফ যে তরফ রাজ্যের প্রথম রাজধানী ছিল তা মুড়ারবন্দের প্রাচীন ইমারতের ধ্বংসাবশেষ নগরায়নের স্থাপত্যরাীতি এ সত্য প্রমান করে।

বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক জনাব সৈয়দ মোস্তফা কামাল সাহেবের মতে হযরত সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপাহসালার (র:) এবং তাঁর পরবর্তীতে অধ:স্থন পুরুষ অন্তত তিন থেকে চার পুরুষ পর্যন্ত পরিবার পরিজনসহ মুড়ারবন্দে একসাথে বসবাস করেন। পরবর্তীকালে বংশ বৃদ্ধি, ধর্মপ্রচার, পীর-মুরীদ্বানী, রাজ্যের ভাগ বাটোয়ারা ইত্যাদি বিভিন্ন কারনে বিভিন্ন স্থানে হযরত সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপাহসালার (র:)’র অধ:স্থন পুুরুষগণ ছড়িয়ে পরেন। 04ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায় মুসলিম বিজয়ের পরবর্তী পর্যায়ে হযরত সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপাহসালার (র:)’র জীবদ্দশায় মুড়ারবন্দ দরবার শরীফ ইসলাম প্রচারের প্রধান মরকজ গড়ে উঠেছিল। মুড়ারবন্দে বড় খানকা শরীফ ছিল এবং এই খানকা শরীফের পাশেই হযরত সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপাহসালার (র:) কে সমাহিত করা হয়।

(মাসিক মদীনা, ডিসেম্বর ১৯৭৭ই)। হযরত সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপাহসালার (র:) যে মুড়ারবন্দে বসবাস করতেন তার বড় প্রমান হল তাঁর মাজার শরীফ। তিনি অন্য কোথায় যদি বসবাস করতেন তবে তাঁর মাজার অন্য স্থানে হত। এখনো মুড়ারবন্দ দরবার শরীফে সিপাহসালার সৈয়দ নাসি উদ্দিন (র:)’র গোর চিল্লা খানা (মাটির নিচে সুড়ঙ্গ) ধ্বংস হয়ে যায়নি যেখানে তিনি প্রায়ই ধ্যন মগ্ন অবস্থায থাকতেন। 02এই গোর চিল্লা খানায় তাঁর অধ:স্থন পুরুষগণ অনেকই চিল্লা করেন। মুড়ারবন্দে হযরত সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপাহসালার (র:)’র ওযুর পাথরও রয়েছে। বড় বড় ইমারতের পিলার এখানো অক্ষত অবস্থায় রয়েছে যা মানুষ দাড়া-গুটি নামে জানে। এগুলো একটার সাথে অন্যটার পরস্পর ইন্টার-লক করে বড় বড় ইমারতের পিলার হিসাবে ব্যবহার করা হত।

দরগাহ শরীফের পূর্ব দিকে ধান ক্ষেতের মধ্যে বড় নয়া দেওরী ও ছোট নয়া দেওরী নামক দুটি উচুু স্থান রয়েছে যেখানে হযরত সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপাহসালার (র:)’র অধ:স্থন পুরুষ কয়েক জনের বাড়ী ছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। হযরত সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপাহসালার (র:)’র মাজার শরীফের দক্ষিন পাশে তাঁর ব্যবহৃত হুজরা খানা রয়েছে। 08যার এক পাশের দেওয়াল এখনো অক্ষত অবস্থায় আছে। যেটি সম্রাট আলা উদ্দিন খিলজীর সময়কার দিল্লীর কুতুব মিনার কমপ্লেক্সের ইমারত গুলোর স্থাপত্যরীতির সাথে মিলে যায়। তারমানে হযরত সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপাহসালার (র:)’র জবিদ্দশায় এই হুজরা খানাটি নির্মিত হয়েছিল। মুড়ারবন্দ দরবার শরীফের নিকটবর্তি কাজীরখিল নামক স্থানে কাজীরা বসবাস করতেন ও রাজ্যের বিচার বিভাগ দেখাশুনা করেন।

তৎকলিন সময়ে কাজী বিচার বিভাগে কাজ করতেন এবং রজধানীর নিকটে বসবাস করতেন। কাজী নূর উদ্দিনের ভাই কাজী ছলিম উদ্দিন বা সামশুদ্দিনের মাজার কাজীরখিলে অবস্থিত। মুড়ারবন্দ দরবার শরীফ তরফ রাজ্যের প্রথম রাজধানী ছিল বলেই মুড়ারবন্দ দরবার শরীফের নিকটে কাজীরখিল নামক স্থানটি অবস্থিত।07গবেষণায় শেষ কথা বলতে কিছু নেই, গবেষণা কর্ম সর্বদাই চলমান প্রক্রিয়া। আমি আমার গবেষনার ফসল তুলে ধরলাম, আমার গবেষনা কতটুকু বস্তুনিষ্ঠ তা শ্রদ্ধেয় পাঠক মহলের বিবেচনায় রইল। আশা করি আগামী নতুন প্রজন্মের গবেষকদের গবেষণার চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে মুড়ারবন্দ দরবার শরীফ সম্পর্কিত ইতিহাসের বিস্মৃত আলোকিত অধ্যায়গুলো উঠে আসবে। উল্লেখ্য তরফের কোন ইতিহাসে যদি মুড়ারবন্দ দরবার শরীফের প্রসঙ্গ অনুল্লেখ থাকে তা অসম্পুর্ন্ন ইতিহাস বলে বিবেচিত হতে বাধ্য।

(Visited 44 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here