বিতর্কিত ৫৭ ধারা নিয়ে নতুন চিন্তা

0
189

5সিলেটের সংবাদ ডটকম ডেস্ক: বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে সরকার তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওই ধারায় সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

এর সূত্র ধরে বাক্স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারের অন্তরায় এই ধারাটি বাতিলের দাবি প্রায় সর্বজনীন হয়ে উঠেছে। ২০১৩ সালে করা এই আইনের ৫৭ ধারাটির অপব্যবহার ও প্রয়োগে স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এক সপ্তাহ ধরে বেশ সোচ্চার হয়ে উঠেছে। আইনজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞরা এটাকে অসাংবিধানিক অভিহিত করে তা সংশোধনের দাবি তুলেছেন।

তাঁরা বলেছেন, ধারাটি সুস্পষ্ট না হওয়ায় এর অপব্যবহার বা অপপ্রয়োগ হচ্ছে। তবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক মনে করেন, আইনটির অপব্যবহার হয়েছে, এটা বলা যাবে না। কিছুসংখ্যক লোক বলছেন, এটি বাক্স্বাধীনতা রোধ করছে। গতকাল শনিবার রাতে আনিসুল হক বলেন, ‘আমরা বাক্স্বাধীনতার পক্ষে। কিন্তু যেহেতু ধারাটি নিয়ে কথা উঠেছে, সেহেতু এটি পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে। পর্যালোচনায় যদি দেখা যায় যে এটি বাক্স্বাধীনতার অন্তরায়, তাহলে অবশ্যই তা বাদ দেওয়া হবে।

আর যদি দেখা যায়, ধারাটি বাক্স্বাধীনতার অন্তরায় নয়, তাহলে সেটি বহাল থাকবে। আইনমন্ত্রীর এ বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ আইনজীবী তানজীব উল আলম বলেন, ‘৫৭ ধারা বাতিল করা সময়ের দাবি। এটা করলে ওনাকে অভিনন্দন জানাব।

এর পাশাপাশি অনুরোধ করব, আইনটি যেন এমনভাবে হয়, যাতে মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন থাকে। ওই আইনজীবীর মতে, আইনটি শুধু পর্যালোচনা করলেই হবে না, মত প্রকাশের অধিকার এখনকার মতো যেন ক্ষুণ্ন না হয়, সেটি মাথায় রেখেই এ কাজটি করতে হবে। তাঁর মতে, আইনটি অপব্যবহারের আশঙ্কা যে আছে, তা ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। তিনি বলেন, গত এপ্রিলে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সংবিধান পরিপন্থী হওয়ায় সে দেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৬৬-এ ধারাকে সংবিধান পরিপন্থী বলে রায় দিয়েছেন।

তথ্যপ্রযুক্তি আইন: বাক্স্বাধীনতার অন্তরায় হলে অবশ্যই তা বাদ দেওয়া হবে: আইনমন্ত্রী সরকারের একাধিক সূত্র জানায়, তথ্যপ্রযুক্তি-সংক্রান্ত বিষয়, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং এ-সংক্রান্ত অপরাধের শাস্তির বিষয়ে একটি নতুন আইন প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার বিষয়টিও ওই আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

প্রথমে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০১৫ নাম দেওয়া হলেও সামগ্রিকতা বিবেচনায় এটি ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন, ২০১৫ নামকরণের প্রস্তাব করা হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী এবং মন্ত্রণালয়ের সচিব দেশের বাইরে থাকায় আইনটির সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে তাঁদের বক্তব্য জানা যায়নি। তবে এ সম্পর্কে জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হারুনুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, আইনটির প্রথম খসড়া তৈরি হয়েছে।

সেই খসড়ার ওপর এখন কাজ চলছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক যাবতীয় বিষয় ওই আইনে অন্তর্ভুক্ত থাকছে। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি যদি ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি প্রদান করা হয়, তাহা হইলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ।

এই ধারায় অপরাধের শাস্তি সর্বোচ্চ ১৪ বছর ও সর্বনিম্ন ৭ বছর কারাদণ্ড এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল ১৯ আগস্ট প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইনটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ, সংবিধান আমাদের কথা বলার স্বাধীনতা দিয়েছে। আর ৫৭ ধারা তা হরণ করেছে।

তাই আমরা চাই, আইনটি বাতিল করা হোক। আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত গত মঙ্গলবার প্রকাশ্যে এই আইনের সমালোচনা করে বলেন, ৫৭ ধারার ব্যবহার ও প্রয়োগের বিষয়গুলো সুস্পষ্ট না করা হলে এর অপব্যবহার অব্যাহত থাকবে। আইনজ্ঞরা বলছেন, ২০১৩ সালে আইনটি হলেও এত দিন এর বিধি তৈরি করা হয়নি।

তা ছাড়া আইনের এই ধারাটি এতটাই অস্পষ্ট যে এই আইনে যখন-তখন যাকে-তাকে ধরা যায়। এর সর্বশেষ দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে প্রবীর সিকদারকে গ্রেপ্তারের ঘটনা। ফেসবুকে নিজের জীবন সম্পর্কে শঙ্কা প্রকাশ করে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন তিনি। এ নিয়ে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ১৯ আগস্ট প্রবীর সিকদার জামিনে মুক্তি পান।

যদিও মামলাটি এখনো আছে। প্রবীর সিকদার বলেছেন, ‘আমাকে যে ৫৭ ধারায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেটি বাতিলের দাবি জানাই। গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারও বলেছেন, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বাক্ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। অথচ ৫৭ ধারায় বাক্স্বাধীনতাকে খর্ব করা হয়েছে, যা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। গত শুক্রবার শাহবাগে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে তাঁরা এই দাবি তোলেন।

(Visited 1 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here