চিরতার চমক

0
804

0 (36)ফারহানা মোবিন: এই সময়ের অসুখগুলোর মধ্যে বসন্ত অন্যতম। দিনে গ্রীষ্মকালীন গরম আর ভোরে শীতকালের মতো ঠান্ডা। এই ঠান্ডা-গরমের সংমিশ্রণে বেড়েই চলছে বসন্তের জীবাণু, হাঁচি, কাশি, সর্দি, টনসিলে ইনফেকশনের পরিমাণ। এই অসুখগুলোর বিরুদ্ধে উৎকৃষ্ট হাতিয়ার হলো চিরতা। বাজারে চিরতার পাতলা ডালপালা বিক্রি হয়।

এগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করে গ্লাস বা বাটিতে পানিতে সারা রাত ভিজিয়ে রেখে সকালে ওই পানি খেতে হয়। সংক্রামক অসুখগুলোর বিরুদ্ধেও রয়েছে চিরতার অগ্রণী পদক্ষেপ। চিরতা দেহের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে। গবেষণা করে দেখা গেছে, যাঁরা নিয়মিত তিতা খাবার খান, তাঁদের অসুখ হওয়ার প্রবণতা কম থাকে। যেকোনো কাটা, ছেঁড়া, ক্ষতস্থান দ্রুত শুকায়।

ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্য চিরতা ভীষণ জরুরি পথ্য। চিরতার রস দ্রুত রক্তে চিনির মাত্রা কমিয়ে দেয়। ফলে ডায়াবেটিস থাকে নিয়ন্ত্রণে। উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরল, উচ্চরক্তচাপ, অতি ওজনবিশিষ্ট ব্যক্তির জন্যও চিরতা দরকারি। টাইফয়েড জ্বর হওয়ার পর আবারও অনেকের প্যারাটাইফয়েড জ্বর হয়। তাই টাইফয়েড জ্বরের পরে চিরতার রস, করলা খেলে যথেষ্ট উপকার পাওয়া যায়। চিরতার রস কৃমিনাশক, বীর্যবর্ধক হিসেবে কাজ করে। তারুণ্য ধরে রাখতেও এর গুরুত্ব অপরিসীম।

শরীরের ঝিমুনিভাব, জ্বরজ্বর লাগা এই সমস্যাগুলো দূর করে চিরতার রস। দেখতে কালচে কাঠির মতো। কিন্তু এর গুণ বহুবিধ। যারা নিয়মিত তিতা বা চিরতার রস খায়, তাদের ফুট পয়জনিং (খাবারের মাধ্যমে দেহে রোগজীবাণু ঢুকে দেহে অসুখ তৈরি করা) হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। এ ছাড়া চিরতা রক্ত পরিষ্কারক হিসেবেও কাজ করে।

যাঁদের ডায়াবেটিস নেই কিন্তু রক্তে চিনির পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় সর্বদা বেশি থাকে, তাঁদের জন্য চিরতা গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।চিরতা একটি ভেষজ উদ্ভিদ বাংলাদেশ সহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে প্রচুর জন্মে। জেসিএনেসি বর্গের অন্তর্গত এই গাছটির বৈজ্ঞানিক নাম Swertia chirayita (Roxb. ex Fleming) H. Karst.। হিন্দীতে এর নাম “চিরায়াতা”।

বর্ণনা:- চিরতা বর্ষজীবি উদ্ভিদ। গাছটির গড় উচ্চতা প্রায় দেড় মিটার। গাছের পাতা কম-বেশী ১০ সে.মি. দীর্ঘ। পাতার অগ্রভাগ সূঁচালো। ফুল বৃন্তহীন, জোড়ায় জোড়ায় বিপরীতমুখী হয়ে ফোটে। ফুল হালকা সবুজের সঙ্গে গোলাপী মেশানো প্রত্যেক পাপড়ি লতিতে এক জোড়া সবুজ গ্রন্থি থাকে। ফল ৬ মি.মি. কিম্বা তারও বেশী লম্বা এবং ডিম্বাকৃতি।

ঔষধী গুণ:- ফুলন্ত অবস্থায় পুরো গাছ তুলে শুকিয়ে নিয়ে ওষুধের কাজে ব্যবহার করা হয়। অত্যাধিক তিক্ততা, জ্বর ও কৃমিনাশক শক্তি এবং পাচকতার গুণে চিরতা সারা ভারতে সুপ্রসিদ্ধ। ঔষধী গুণে, চিরতা জেণ্টিআনা কুরুর অনুরূপ। জ্বর, অতিসার এবং দুর্বলতায় চিরতা খুব উপকারী। ম্যালেরিয়াতেও দেওয়া হয় কিন্তু চিরতার জ্বর কমানোর শক্তি পরীক্ষায় সম্প্রমাণিত নয়।

চিরতার নামকরন:- বেদগ্রন্থে গুহাবাসীকে বলা হতো ‘কিরাত’। মনুর মতে, কিরাত মানে নিকৃষ্ট শ্রেণীর মানুষ। এরা ছিল সদাচারভ্রষ্ট। এরা গুহাতেই খেত এবং সেখানেই মলমূত্র ত্যাগ করত। এ ছাড়া তারা সর্বদা অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন থাকত এবং নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হতো। তাদের সেসব রোগকে নিরাময় করত যে ভেষজ, তার নামই কিরাততিক্তা। কিন্তু বৌদ্ধ শ্রমণরা এই কিরাত শব্দটিকে উচ্চারণ করত ‘চিরাত’ বলে।

সেই থেকে কিরাততিক্তার নাম হয়েছে ‘চিরাত’ এবং ক্রমবিবর্তনে ‘চিরতা’ নাম সর্বত্র প্রসিদ্ধ। পৃথিবীতে প্রায় ১৮০ প্রকার চিরতাজাতীয় গুল্ম আবিষ্কার হয়েছে। তার মধ্যে ভারতবর্ষে রয়েছে ৩৭ প্রকার। প্রকৃত চিরতা উদ্ভিদ ২ থেকে ৫ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়। এদের কা-গুলো গোল ও শাখাশূন্য। শরৎকালে এতে ফুল হয়। তখন এলাকাবাসী এগুলো শিকড়সহ তুলে বাজারজাত করে। ওষুধার্থে সমগ্র উদ্ভিদই ব্যবহৃত হয়। প্রাচীন বিজ্ঞ বৈদ্যদের মতে, চিরতা মৃদু বিরেচক, ক্রিমিঘ্ন, জ্বরঘ্ন, অগি্নর উদ্দীপক, ক্ষুধাবর্ধক।

হিন্দু চিকিৎসকরা বলেন, চিরতা বল্য, ক্রিমিনাশক, জ্বরঘ্ন। হেকিমরা বলেন, এটি সি্নগ্ধ, পিত্তজনিত জ্বর ও দাহ নিবারক। পশ্চিম ভারতীয়রা বলেন, এটি হাঁপানিতে ভালো ফলদায়ক। আয়ুর্বেদীয় গ্রন্থাগাররা নানাভাবে চিরতার ব্যবহার সমর্থন করেছেন। চরক এটিকে লেখন, স্তন্যশোধন, তৃষ্ণা নিবারণ রক্তবমি ও উদরের বিভিন্ন রোগে ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। হারিত বলেন, গর্ভকালীন বমিতে চিরতা ভেজানো পানি উপযোগী।

মুষ্টিযোগ হিসেবে এটি চুলকানি, ক্রিমি, কুষ্ঠ, জ্বালা, গর্ভকালীন বমি, জ্বর-পরবর্তী দুর্বলতা, অ্যালার্জি, রক্তপিত্ত, স্তন্যশোধন, ইনফ্লুয়েঞ্জা, সর্দি-কাশিসহ হাঁপানি, প্রমেহ কোষ্ঠবদ্ধ, অগি্নমান্দ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। দেশীয় সালসায় চিরতার ক্বাথ দেয়া হয়। কবিরাজরা পুরনো জ্বরে যে সুদর্শন চূর্ণ ব্যবস্থা করেন, তা ওই চিরতা থেকে প্রস্তুত। অ্যালোপ্যাথিক মতে, রাসায়নিক উপায়ে চিরতার বীর্য বের করে বলাকারক ওষুধ প্রস্তুত করা হয়।

মোট কথা, চিরতা একটি পিত্তদোষ নিবারক জ্বরঘ্ন ওষুধ। পুরনো জীর্ণজ্বরে এটি বহুকাল ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পিত্তাধিক্যযুক্ত সবিরাম জ্বর, যকৃতের ক্রিয়াঘটিত গোলযোগ, অজীর্ণ, ক্রিমিজনিত উপসর্গগুলোর ক্ষেত্রে এর উপযোগিতা দেখা যায়। গ্রহণী রোগের মতো দুশ্চিকিৎস্য ব্যাধিকেও এই ভেষজের দ্বারা সাধ্যায়ত্ত করা যায়। অধিক মাত্রায় চিরতা খেলে গাত্রদাহ, বমনেচ্ছা, এমনকি বমি পর্যন্ত হতে পারে। সর্বোপরি বিবেচনায়, চিরতা হোক আপনার নিত্যসঙ্গী। লেখক:-মেডিকেল অফিসার (গাইনী এন্ড অবস্) স্কয়ার হাসপাতাল, ঢাকা, বাংলাদেশ।

(Visited 42 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here