আজকের শিশু : আগামীর স্বপ্ন

0
1629

0 (39) সৈয়দ মুস্তাফিজুর রহমান: আজকের শিশু/পৃথিবীর আলোয় এসেছে,আমরা তার তরে একটি সাজানো বাগান চাই। পৃথিবীর নির্মল আলোয় আসা শিশুদের মাঝে লুকায়িত থাকে আগামীর স্বপ্ন, আগামীর সোনালী স্বপ্নীল ভবিষ্যত। শিশুরাই হবে দেশ ও জাতি গঠনের সু-কারিগর। যে শিশুরাই হতে চেয়েছিল স্কুলগামী শিক্ষার্থী তারা এখন যুক্ত হচ্ছে শিশু শ্রমে কিংবা ভিন্নধর্মী লাভজনক ক্ষেত্রে।

ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে কেউ আজ শিশু শ্রমিক কিংবা পথের ভিখারী। যেসময় হাতে থাকার কথা বই খাতা কলম সেসময় থাকে তার হাতে শ্রমের বোঝা কিংবা ভিখারীর থালা। সমাজের অনেক দরিদ্র পরিবার তাদের সন্তানদেরকে অল্প বয়সে শ্রমে যুক্ত করায় যাতে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যায়। পরিবারের কর্তা বাবা অতিরিক্ত আয়ের কথা চিন্তা করেই তাদের ছোট ছোট সন্তানদেরকে পাঠিয়ে দেন বিভিন্ন শ্রম প্রতিষ্ঠানে।

কেউ শ্রম বিক্রি করে পেটের দায়ে কিংবা পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করতে। এই সব শিশু শ্রমিকেরা শ্রম দেয় অনেক বেশি তবে মূল্য পায় খুবই কম। বেতন এদের বলতে একেবারেই নগন্য। স্বল্প দামে বেশি বেশি কাজ করায় সুবিধাভোগী মালিকশ্রেণি। মানুষের জীবন কর্মমুখর জীবন। শ্রমের মাধ্যমে গড়ে তোলে সাফল্যের ইমারত। জীবনের অস্তিত্ব ঠিকিয়ে রাখতে শ্রমের বিকল্প নেই। শ্রমই সাফল্যের চাবিকাঠি কিন্তু অল্প বয়সে শ্রমে যুক্ত হওয়ার ফলে কোমলমতি শিশুদের সাফল্য সম্ভাবনা নিমিষেই হারিয়ে যায় শ্রমের গহ্বরে।

যেই বয়সে খেলা করার কথা সেই বয়সে কাঁধে তুলে নেয় দায়িত্ব নিজের কিংবা পরিবারের। শ্রমে যুক্ত হয়ে হারিয়ে ফেলে নিজের চেনা পথ, নিজের সোনালী রঙিন দিন। এইসব শিশু শ্রমিকেরা হারিয়েছে কেউ বাবা-মা কিংবা উভয়কেই। বাবা মাকে হারানোর ফলে পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে শিশু শ্রমে যুক্ত হয় যায় শিশুরা। অনেকে শিশু শ্রমিকের বাবা তাদের এবং মাকে ফেলে রেখে চলে যায় পরবর্তীতে শুরু করে নতুন সংসার। বাবা মাকে ছেড়ে দিয়ে চলে যায়।

পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব কাধে নিতে হয় মাকে। মা নিজে শ্রমে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি সন্তানদেরকেও যুক্ত করেন ছোটখাটো পেশায় যাতে করে অর্থের চাকা কিছুটাও হলে দ্রুত ঘুরতে পারে। বাসা বাড়ি কিংবা ঝিয়ের কাজ করে থাকেন স্বামী পরিত্যক্ত অসহায় মায়েরা। অভাবের তাড়নায় নিজে কাজ করার পাশাপাশি আদরের সন্তানদেরকে পাঠাতে হয় শ্রমে। প্রত্যকের শিশুর মধ্যেই রয়েছে সুপ্ত প্রতিভা। প্রতিভার বিকাশ হয়না বরং এদের প্রতিভা হারিয়ে যায় শ্রমের গহ্বরে।

অল্প বয়সে শ্রমের স্পর্শে বিপথে চলে যায় শিশুদের কচি মনের রঙিন স্বপ্নগুলো। নরম হাতে কঠিন শ্রমের কাজ করে থাকে কোমলমতি শিশুরা। বয়স আর কত হবেই এইসব শ্রমজীবি শিশুদের। যে ছেলেটি বই খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা সেই ছেলে আজ মাছ বাজারে মাছের ভাড় বইেছে কিংবা মাছ কাটার কাজে নিয়োজিত। শিশু শ্রমে যুক্ত হয়ে কেউ হচ্ছে চা বিক্রেতা, কারখানার শ্রমিক, ওয়েল্ডিং শ্রমিক, পোষাক শ্রমিক, মৎস শ্রমিক সহ হরেক রকমের শ্রমিক।

শিশু শ্রমিকের পাশাপাশি চোখে পড়ে শহরের বিভিন্ন পাড়া মহল্লা কিংবা ফুটাপাতের অনেক পথ শিশু। ভিক্ষাবৃত্তি অধিক লাভজনক বিনিয়োগবিহীন ব্যবসা। যারা ভিক্ষাবৃত্তি করে থাকে অর্থ আয় করে থাকে। শহর নগর জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে ভিখারী শিশুদের বিভিন্ন দল। এইসব দলের থাকে একজন লিডার বা গডফাদার। সারাদিনের ভিক্ষায় অর্জিত অর্থ তুলে দিতে হয় ঐসব অদৃশ্য ঘাতকরূপী গডফাদারদের হাতে। ১৯৫৪ সাল হতেই বিশ্ব শিশু দিবস পালন করা হচ্ছে।

প্রতিটি বছর এই দিবসটি পালন করা হয় বিভিন্ন অনুন্ঠান, বিভিন্ন কার্যক্রমের সাথে। কিন্তুশ্রমজীবি শিশুদের জন্য কতটুকু করা হয়েছে। ১৯৫৯ সাল হতে সম্মিলিতভাবে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ ঘোষণা করেন। এই সনদে শিশুদের বিভিন্ন অধিকার নিয়ে আইন নিয়ে বলা হলেও বাস্তবে কতটুকু সুবিধা পাচ্ছে কোমলমতি শ্রমিক শিশু, উদ্ভাস্তু শিশু, ভিখারী শিশু ও পথ শিশুরা। শিশু শ্রমিকের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে ২০ লাখ গৃহ শ্রমিকের মধ্যে ৯৩ শতাংশই হচ্ছে অর্থ্যাৎ ১৮ লাখ ৬০ হাজার শিশুই গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছে।

এসব গৃহশ্রমিকরা মানসিক, শারিরিক, মৌখিক, যৌন নির্যাতন ও আর্থিক শোষণের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সিলেট শহরের বিভিন্ন রেস্তোরা, হোটলে রয়েছে অনেক শিশু শ্রমিক,যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। জাতিসংঘ শিশু সনদ অনুসারে ১৮ বছরের নিচে প্রত্যেকেই শিশু বলে গণ্য হয়। রেস্তোরা, হোটেলের পাশাপাশি সিলেটের কাজির বাজারস্থ মাছ বাজারে দেখা যায় অসংখ্য মৎস্য শিশু শ্রমিকের। কেউ মাছের ভাড় বয়ে থাকে আবার কেউ মাছ কাটার কাজ করে থাকে।

মাছ বাজারে সারাদিন কাজ করে অধিকাংশ শিশু শ্রমিকের জুটে সর্বনিম্ন ৫০ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা। আমাদের দেশের শ্রমিক শিশুরা প্রায় ৩০০ ধরণের কাজ করে থাকে। এসবের মধ্যে ৪৫ টির বেশিই কাজই হচ্ছে অধিক ঝুকিপূর্ণ। শিশু শ্রমিকের মধ্যে ৩২ ভাগ শিশু যৌনকর্মে যুক্ত। শ্রমিকের বৃহৎ একটা অংশ হচ্ছে পথ শিশু। বেঁচে থাকার তাগিদে এরা নিজের শ্রম বিক্রি করে থাকে বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন পেশায়। পথ শিশুদের বৃহৎ অংশ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকান্ডে জড়িয়ে যায়।

শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা অনেক বেশি। শহরে কাজ করে থাকে ১৫ লাখ ও গ্রামে ৬৪ লাখ শিশু শ্রমিক রয়েছে। এসব শিশু শ্রমিকের মধ্যে ৪৫ লাখ শিশু ঝুকির্পূণ পেশায় যুক্ত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুারো ও আইএলও’র জরিপ মতে কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ রয়েছে ৪৫ ধরণের। আর এর মধ্যে ৪১ টি কাজে অংশগ্রহণ করে শিশুরা। শিশু শ্রমিকের মধ্যে ৭৩ দশমিক ৫০ ভাগ শিশু হচ্ছে পুরুষ আর ২৬ দশমিক ৫০ ভাগ নারী।

৬ দশমিক ৭০ ভাগ আনুষ্ঠানিক খাতে আর ৯৩ দশমিক ৭০ ভাগ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০০৮ সালের জরিপ অনুসারে দেশে শূণ্য থেকে ১৭ বছর পর্যন্ত শিশুর সংখ্যা ৬ কোটি ৭৭ লাখের বেশি। এদের মধ্যে প্রায় ৩৫ লাখ শিশু নানা কাজের সাথে জড়িত। ‘শৈশব বাংলাদেশ’ নামে এক সংগঠনের জরিপ অনুযায়ী রাজধানীতে প্রায় তিন লাখ শিশু গৃহ পরিচালিকার কাজ করছে যাদের বয়স ১৬ বছরের নিচে। ইউনিসেফের তথ্য অনুসারে গৃহপরিচালিকার ৮৬ শতাংশ মেয়ে। ৩০ শতাংশের বয়স ৬ থেকে ১১ বছর আর বাকিদের বয়স ১২ থেকে ১৬ পর্যন্ত।

এরা প্রতিদিন ১৪-১৬ ঘন্টা কাজ করে থাকে। জাতীয় শিশু নীতি ২০১১ এর ৮ এর ৮.৯ বলা হয় যে সকল প্রতিষ্ঠানে শিশু নিয়োজিত আছে, সেখানে শিশুরা যেন যেকোনে ধরণের শারিরিক, মানসিক, ও যৌন নির্যাতনের শিকার না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের কার্যক্রম মূল্যায়ন করতে হবে। বাস্তবে এর চিত্র ভিন্ন। ১৯৯০ সালে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ (১৯৮৯) এ স্বাক্ষরকারী ও অনুসমর্থনকারী প্রথম রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি হলো বাংলাদেশ।

আমাদের দেশে কাগজে কলমে আইন আছে ঠিকই কিন্তু তা প্রয়োগ এবং দেখাশুনার মত কোন কার্যকরী ভূমিকা লক্ষণীয় নয়। ১৯৯৪ সালে জাতীয় শিশু নীতি প্রণয়ন করা হয়েছিল কিন্তু এখন পর্যন্ত সঠিক সুনির্দিষ্টভাবে পালনের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে নেই কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নেই। আজকের শিশু আগামীর সোনালী ভবিষ্যত। শিশুরা স্বপ্ন দেখে নিজেদেরকে নিয়ে। কোমল হৃদয়ের শিশুদের রয়েছে সম্ভাবনা স্বপ্নময় ভুবন তৈরির। স্বপ্ন ভুবন তৈরি করে জীবনের নানা রঙের সুখ দু:খের তুলির আচড়ে।

আজকের শিশুরাই আগামীর স্বপ্ন কারিগর। সেই সব স্বপ্ন পূরণ তৈরি হবে তখনই যখন সেই কোমলমতি শিশুটি পারবে নিজের শৈশব, কৈশোরের লালিত স্বপ্নভূমির ভিত্তি মজবুত করতে। সেই স্বপ্নের ভিত্তি মজবুত হবে যখনই একটি শিশু পাবে সুন্দর-সুগঠিত সমাজ। যে সমাজে বেড়ে উঠবে শিশুর সোনালী ভবিষ্যত, শৈশব স্বপ্ন। শৈশব স্বপ্ন বিকশিত হবে জীবন পরিবর্তনের নবধারায় নবরূপে আর এরই সাথে আমাদের প্রিয় দেশ,প্রিয় জন্মভূমি পৌছে যাবে সাফল্যের শীর্ষ চূড়ায়।

(Visited 49 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here