প্রাচীন তরফ রাজ্যের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত

0
1764

000সৈয়দ মুরাদ আহাম্মদ:- পরম করুনাময় আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে হযরত শাহ জালাল (র) ও হযরত সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপাহশালার (র:) কর্তৃক সিলেট বিজয় হয়। ১৩০৪ খ্রিষ্টাব্দে তরফ রাজ্য (বর্তমানে হবিগঞ্জ) বিজয় হয় হযরত সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন (র:) কর্তৃক। তরফ বিজয়ের আগে এ সামন্ত রাজ্যের নাম ছিল তুঙ্গাচল। রাজধানী ছিল রাজপুর।

রাজপুর গাজীপুর ইউনিয়নের অর্ন্তগত। তরফ বিজয়ের যাত্রাকালে হযরত শাহ গাজী (র:) আচক নারায়নের রাজ্যের দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে বলে ছিলেন, ইস তরফ যাওগে। এ থেকেই রাজ্যের নাম হয় তরফ। উত্তরে শাখা বরাক নদী। দক্ষিণে বেজুড়া পরগনা ও ত্রিপুরা রাজ্য। পূর্বে ভানুগাছের পাহাড়।

পশ্চিমে লাখাই। পরবর্তীকালে বিশাল তরপ রাজ্য ভাগবাটোয়ারা হয়ে ২৩টির বেশি পরগনার সৃষ্টি হয়। পরগনাসমূহ: (১) আদি বা মুল তরপ (২) দাউদ নগর     (৩) গদাহাসান নগর (৪) নূরুল হাসান নগর (৫) উসাই নগর (৬) রিয়াজপুর, (৭) ফয়েজাবাদ, (৮) পুটিজুরী, (৯) বালিশিরা, (১০) বিশগাঁও, (১১) আনন্দপুর, (১২) বামৈ, (১৩) রঘুনন্দন, (১৪) বেজুরা, (১৫) রিচি, (১৬) জয়নাবাদ, (১৭) মুগীশপুর, (১৮) উজানী নগর, (১৯) উচাইল, (২০) গিয়াস নগর, (২১) কাশিম নগর (২২) লাখাই (২৩) মন্তলা প্রভৃতি। এক সময় বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল (সতরখগুল) এবং নেত্রকোণা জেলার জোয়ানশাহী পরগনা তরপ রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল।

ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায় যে, খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকে (১৪/১৫ হিজরী) ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা:) এর শাসন আমলে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে হযরত মামুন (রা:) ও হযরত মোহায়মিন (রা:) নামক সাহাবীদের নেতৃত্বে একদল মুবাল্লিগ বাংলাদেশে আগমন করেন। তাই সিলেট বিজয়ের পূর্বে এ দেশে খুব অল্প সংখ্যক মুসলমানদের বসবাস করার প্রমাণ পাওয়া যায়।

তাদেরই উত্তর পুরুষ গৌড় রাজ্যের (বর্তমানে সিলেট) বোরহান উদ্দিন (র:) ̔র পূত্রের আকিকা উপলেক্ষ্য গরু জবাই করার কারনে রাজা গৌাড়াগোবিন্দ কর্তৃক এবং তুঙ্গাচল রাজ্যের (পরে তরপ বা তরফ বর্তমানে হবিগঞ্জ) কাজী নূরউদ্দিন (র:) র পুত্রের বিয়ে উপলক্ষে গরু জবাই করার অপরাধে প্রানদন্ডে দন্ডিত হন। গাজী বোরহান উদ্দিন (রা:) ̔র ফরিয়াদ ক্রমে বাংলার সুলতান শামসূদ্দিন ফিরোজ শাহ ̔র নির্দেশে সিকান্দর গাজীর নেতৃত্বে প্রেরিত সৈন্যরা গৌড়গোবিন্দের অগ্রিবান ও যাদুবিদ্যার কাছে বার বার পরাজিত হন এবং এই সংবাদটি দিল্লীতে পৌঁছান।

অন্যদিকে কাজী নূর উদ্দিন (র:) ̔র ভাই কাজী হেলিম উদ্দিন (র:) দিল্লী রাজদরবারে উপস্থিত হয়ে সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজীর নিকট অভিযোগ উপস্থাপন করেন। সম্রাট হযরত সৈয়দ নাসির উদ্দিন (র:)’র আধ্মাত্বিক শক্তির পরিচয় পেয়ে সিপাহসালার (সিপা-ই-সালার) পদে ভূষিত করে যাদুবিদ্যার দেশ গৌড় ও তুঙ্গাচল অভিমুখে পাঠান।

সিপাহসালার (বা সিপা-ই-সালার) পদ এমন একটি পদ যা সাম্রাজ্যের সকল স্থানের সকল সেনার উপর আধিপত্য করে। কাজেই সিকান্দর গাজীর সৈন্যদেরও হযরত সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপাহসালার (র:) ̔র আধিপত্য স্বাকীর করতে হয়। সম্রাটের অনুরোধে একদল সৈন্যবাহিনীসহ তাঁর নেতৃত্বে সিলেট বিজয়ে রওয়ানা হলে পথিমধ্যে ত্রিবেনীর (সূবর্ণগ্রাম বা সপ্তগ্রাম মতান্তরে এলাহাবাদ) কাছে তারা হযরত শাহ জালাল (র:) ̔র মোলাকাত লাভ করেন।

হযরত শাহ জালাল সহ ৩৬০ আউলিয়ার পাকপবিত্র পূন্য পদস্পর্শ লাভের কারনেই সিলেটকে “বাংলার আধ্যাত্মিক রাজধানী” হিসাবে গণ্য করা হয়। হযরত সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপাহসালার (র:) সহ ১২ জন আউলিয়া তরপ রাজ্যে আগমন করেন বলেই তরফকে (বর্তমানে হবিগঞ্জ) “বার আউলিয়ার মুল্লুক” বলা হয়।

পরবর্তিতে তিনি মুড়ারবন্দ নামকস্থানে বসতি স্থাপন করেন এবং এখান থেকেই ধর্মের প্রচার ও প্রসার করা হয় বলেই মুড়ারবন্দ দরবার শরীফকে “বাংলার আধ্যত্মিক ক্যান্টরমেন্ট” হিসাবে গন্য করা হয়। তরফ রাজ্যের প্রাকৃতিক অবস্থা খুবই স্বাস্থ্যকর ছিল।

ভিন্ন দেশীয় লোকজন যারা এই দেশে কিছুদিন বসবাস করে গেছেন তারা এখানকার প্রাকৃতিক অবস্থার খবুই প্রসংশা করেছেন বলে ইতিহাসে প্রমান পাওয়া যায়। একটি প্রবাদে আছে- “জায়গার নাম তরফ, ঘরে ঘরে হরফ, আদমী লোক শরফ। তরফে শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত খান্দানী পরিবারের সংখ্যা কম ছিল না। পারস্য ভাষা বিষারদদের জন্য এস্থান বিখ্যাত ছিল। তরফের অনেক স্থানে আরবী ও ফার্সী মক্তব স্থাপিত হয়ে ছিল বলে জানা যায়। এমনকি অনেক দেশের সম্ভ্রান্ত মুসলমানদের পাচকগণ এখানে এসে পাক প্রণালী শিখে যেত।

তরফের সম্ভ্রান্ত হযরত সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপাহসালার (র:)’র অধ:স্থন খান্দানের পরিবার গুলোর লোকজন দিল্লী, আগ্রা, মুর্শিদাবাদ থেকে, শুরু করে আরাকান রাজ দরবারেও উচ্চ পদস্থ কর্মচারী হিসাবে কাজ করতেন বলে ইতিহাসে প্রমান পাওয়া যায়। হযরত সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপাহসালার (র:)’র অধ:স্থন খান্দানের সুযোগ্য সন্তানরাই দিল্লীর সুলতানদের রাজকুমারদের সম্মানিত উস্তাদ হয়েছিলেন।

তাছাড়া ধর্ম, দর্শন, সুফী-সাধনা, আধ্যাত্মিক বিকাশ, মরমী-মারফতি সঙ্গীত রচনা ও পীর-মুরিদীর মাধ্যমে মানুষের আত্মিক উন্নতি ও নৈতিক শৃঙ্খলা বিধানে হযরত সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপাহসালার (র:)’র অধ:স্থনরা আজও দেশের গৌরবের অধিকারী। হযরত সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপাহসালার (র:)’র বংশধরগণ (অধ:স্থন খান্দান) এতদঞ্চলের সৈয়দ।

১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে অচ্যুতচরন চৌধুরী তত্ত্বনিধি তাঁর ”শ্রীহট্রের ইতিবৃত্ত (পূর্বাংশ)” গ্রন্থে লিখেন সৈয়দের সংখ্যা ৬৫৯৮ জন; তার মধ্যে পুরুষ ৩৩১৫ জন এবং স্ত্রী ৩২৮৩ জন। বর্তমানে হযরত সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপাহসালার (র:)’র অধ:স্থন খান্দানের লোকজন বাংলাদেশর অনেক স্থানে বসবাস করছেন।

তন্মধ্যে- মুড়ারবন্দ, লস্করপুর, সুলতানশী, খান্দুরা, নরপতি, মসাজান, পৈল, দাউদ নগর, চন্দ্রচুরি, রামশ্রী, সুরাবই, বিরামচর, আউশপাড়া, নছরতপুর, উত্তরসুর, মধুপুর, চারাভাঙ্গা, মৌজপুর, ফকিরাবাদ, ব্রাহ্মণডুরা, হিয়ালা, রিচি, কালাইনজুড়া, পাল্লাকান্দি, আমানীপুর, গোবিন্দশ্রী, মাছিহাতা, বানিয়চং, মাঝিশাইল, বৌলাই, হয়বত নগর, জঙ্গলবাড়ী, ভাগলপুর, অষ্টগ্রাম, গোকর্ণ, জেঠাগ্রাম, বেলঘর, কাজীহাটা, গাদীশাল, নাছিরপুর, নুরপুর, মুল্লারাই, কোটআন্দর, লাকুড়িপাড়া, বহুলা, সরাইল, বখতারপুর, ইটনা, পৃতিমপাশা, দিনারপুর, আলিয়ারা, শাহপুর, আন্ধিকোট, নিতাইরচক, বড়আব্দা, ভাউকসার, লাকসাম, রূপসা, কামাড়পাড়া, খুলশপুর সহ আরো বিভিন্ন স্থানে বসবাস করছেন।

মুুড়ারবন্দ দরবার শরীফের বংশ শাখার পীর হযরত সৈয়দ শাহ সাঈদ আহাম্মদ চিশ্তী (র:) ১৯৪৮ ইং সালে পুরাতন ফার্সী নসবনামা থেকে বড় একটি বাংলা নসবনামা তৈরি করেন যেখানে তরফের মূল সৈয়দ বাড়ী গুলো দেখানো হয়েছে। আগের দিনে সম্ভ্রন্ত বনেদী পরিবারের পারিবারিক নসবনামা, কাবিন নামা, দলিল-দস্তাবেজ ফার্সী ভাষায় হাত দিয়ে লেখা হত। কারণ তখন কোন মুদ্রন যন্ত্র ছিল না।

নসবনামা লিখে রাখার কারণ ও প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে হাদিসে আছে, রসুলে খোদা (সা:) বলেছেন, কার সাথে কে কতটা আত্মীয়তা সূত্রে জড়িত সে সম্বন্ধে সুনিশ্চিত হতে চাইলে তুমি তোমার বংশের কুরসিনামা (বংশবৃক্ষ বা নসবনামা) জেনে রাখ। এ সম্পর্কে বিস্তারিত ইবনে খালদুনের ”আল মুকাদ্দিমা” (অনুবাদ- বাংলা একাডেমী, ঢাকা) গ্রন্থে লেখা রয়েছে। ইতিহাসে তরফে তিনটি মুসলমান পরিবারের কথা জানা যায়।

হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার সাটিয়াজুড়ী ইউনিয়নের বর্ডারে চিচিরকোট নামক স্থানে কাজী নূর উদ্দিন, কাজী হেলিম উদ্দিন, কাজী ছলিম উদ্দিন বা সামশুদ্দিন তিন ভ্রাতা পরিবার পরিজনসহ বাস করতেন। কাজী নূর উদ্দিন পুত্রের বিবাহ উপলক্ষে গরু জবেহ করেছিলেন বলে অত্যাচারী রাজা আচক নারায়ন কাজী নূর উদ্দিন ও তাঁর পুত্রকে হত্যা করেন। কাজী হেলিম উদ্দিন এই নির্মমতার প্রতিবাদে দিল্লীর রাজ দরবারে সম্রাট আলা উদ্দিন মুহাম্মদ শাহ খিলজীর কাছে বিচার প্রার্থী হন এবং এর ফলশ্রুতিতেই হযরত সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন (র:) কর্তৃক তরফ রাজ্য বিজয় হয়।

তরফ বিজয় সম্পন্ন হলে শহীদ কাজী নূর উদ্দিনের কন্যার সাথে হযরত সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপাহসালার (র:)’র পুত্র সৈয়দ সিরাজ উদ্দিন (র:)’র (ইতিহাসের আলোকে জন্ম অনুমানিক ১২৮০ খ্রিষ্টাব্দ) শাদী (বিয়ে) মোবারক সম্পন্ন হয়। পরবর্তিতে হযরত সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিপাহসালার (র:) এই পরিবার গুলোর একটি কি দুইটি মুড়ারবন্দ দরবার শরীফের নিকটবর্তি স্থানে নিয়ে আসেন এবং এখানেই তারা বসবাস করেন ও রাজ্যের বিচার বিভাগ দেখাশুনা করেন এবং এই স্থানের নাম কাজীরখিল হয়। তৎকলিন সময়ে কাজী বিচার বিভাগে কাজ করতেন এবং রজধানীর নিকটে বসবাস করতেন। কাজী ছলিম উদ্দিন বা সামশুদ্দিনের মাজার কাজীরখিলে অবস্থিত।

(Visited 88 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here