একটি নিরাপত্তাহীন ও ধনী এলাকার নাম গুলশান!

0
346

88

দিলরুবা শারমিন: গুলশানকে আর নিরাপদ বলতে পারছি না। নিরাপদ বলতে না পারার কারণ নিশ্চয়ই ব্যাখ্যা দিতে হবে না। আর পারছি না অভিজাত বলতেও। কারণ আজকাল চোর ডাকাত গুন্ডারাও টাকা হাতে পেলেই আর বাহিনী হাতে থাকলেই গুলশানের ‘আভিজাত্য’ কিনে ফেলছে।

ফ্ল্যাট বিক্রেতারা যে কার কাছে বিক্রি করছে সেটা তো তাদের জানার দরকার নেই। জমি তো আর এই গুন্ডাদের কিনতে হয় না। দখল নিলেই চলে। আর ‘আভিজাত্য’ বলতে তো আমরা আজকাল বুঝি যার টাকা আছে সেই অভিজাত! হায়রে দেশ!

কথাগুলো শুরুতেই লিখলাম এজন্য যে, গত ১ জুলাই শুক্রবার রাত প্রায় ৯টার কাছাকাছি সময় গুলশান ২ এর ৭৯নং রোডের ‘হলি আর্টিজান বেকারি’ রেস্তোরাঁয় ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক সময়ের নিষ্ঠুর, অমানবিক, ভয়াবহ ঘটনা এখন দেশ ও বিশ্বব্যাপী আলোচ্য বিষয়! হঠাৎ কেন? সেখানে কি নতুন কিছু ঘটেছে? এসবই তো বেশ কিছুদিন ধরে একের পর এক হামলারই ধারাবাহিকতা। যা অনেকেই দীর্ঘদিন যাবত বলে আসছে।

ফলে যারা বলছেন তাদেরকে আমরা সন্দেহ করছি। এমনকি বিদেশি রাষ্ট্রের গোয়েন্দারাও একই কথা বলে আসছে। তাহলে আমরা সতর্ক হইনি কেন? খামোকা যারা সৎ পরামর্শ দিয়েছেন তাদেরকে সন্দেহ করছি কেন? ধনী ও নিরাপদ এলাকার নিশ্ছিদ্রতাকে রীতিমত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে মাত্র ৬/৭ জন তরুণ/ যুবা একেবারে ফিল্মি স্টাইলে!

একদল ধনী ও অভিজাত শ্রেণির মানুষকে জিম্মি করে এবং দানবীয় কায়দায় শেষ করে দিল একঝাঁক প্রাণবন্ত জীবন। কেন? কিভাবে? ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহ্বল ও অপ্রশিক্ষিত পুলিশ বেঘোরে প্রাণ দিল। জান হয়তো আরও গিয়েছে (জানা-অজানা অনেকের) যা আমরা জানতে পারিনি বা ভবিষ্যতেও পারবো না।

 সেটা আর দরকার নাই! কিন্তু এসব দেশি বিদেশির প্রাণ যাওয়া মানে কি আমাদের প্রাণ খুব নিরাপদ? তাহলে গেল কারা? মেট্রোরেলের সাথে সংশ্লিষ্টরা আর পোশাক শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা! সাথে কিছু তাজা সম্ভাবনাময়ী তরতাজা প্রাণ! অদ্ভুত সব কাণ্ড কারখানা! এক বিদেশি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মোটামুটি যতটুকু পেরেছে ভিডিও করেছেন, যার বিনিময়ে আমরা কিছুটা হলেও ঘটনা দেখেছি এবং যার সাহায্যেই নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের বিষয়ে গোয়েন্দা ও সরকার জানতে ও সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে।

অথচ আশেপাশে এমন অনেক বীর বাঙালিই ছিল যে বা যারা হয়তো একটা সম্মিলিত ভূমিকা রাখতেই পারতো! কোথায় গেল সেই বীরত্ব? আর্টিজানে যারা আঘাত হেনেছে তারা কেউ ‘গরিব ঘরের সন্তান নয় বা মাদ্রাসায় পড়েনি’ এটা নিয়ে দেখছি সব জয়গায় তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। কী আশ্চর্য! সন্ত্রাসী শুধুই গরিব ঘরের হবে এটা কোথায় লেখা আছে? ধনীর দুলালরা ফেরেশতা হবে এই হিসাব কে করছে? আগে ভাবুন, ধনী সম্পদ অর্জন করেছেন কিভাবে? নাকি সেটাও আমরা ভুলে গিয়েছি? পৃথিবীর সব দেশে, সব শীরষ সন্ত্রাসী, মাফিয়া ডন, গড ফাদারই ধনী।

টার্গেট যদি হয় কোনো দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আঘাত হানা তাহলে অস্ত্রও তো হতে হবে তেমনই! আর্টিজানে তো আর যদু মধু ঢুকতে পারবে না। সেখানে ‘ট্যাশ’দেরকেই ঢুকতে হবে।  কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, ৬/৭ জন কিভাবে জানতে পারলো যে, সেখানে ঠিক এই মুহূর্তে কতজন আছে? দেশি/বিদেশির সংখ্যা? আগে থেকে নিয়মিত যাতায়াত বা যোগাযোগ না থাকলে নিশ্চিতভাবে টোট্যাল প্ল্যানিং ও ম্যাপিং কেমন করে করলো তারা?

তারা ‘ডু অর ডাই’ নীতিতে বিশ্বাসী একদল সন্ত্রাসী, খুনি  গ্যাস সিলিন্ডারগুলো এমনভাবে রেখেছিল যে, যদি বাইরে থেকে কেউ গুলি করে এবং সেটা সিলিন্ডারে আঘাত হানে তবে সেই আঘাত এর ফল কী হবে সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনকি ভেতরের বন্দী কাউকে কাউকে তারা মানব ঢাল হিসেবেও ব্যবহার করেছে (ভিডিওতে অল্প–স্বল্প যা দেখেছি )।

তাদের সবকিছুই ছিল খুবই পরিকল্পিত! তাদের যেমন ভেতরে লোক ছিল ঠিক তেমনি বাইরেও। আর তাই যতক্ষণ আমাদের প্রাণপ্রিয় সাংবাদিক ভাইয়েরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নানাবিধ প্রশ্ন করে আমাদেরকে সংবাদ জানাবার চেষ্টা করে চলেছিলেন ততক্ষণে ভেতরে যা ঘটার সেই খুনিরা ঘটিয়েই ফেলেছিল। তাদের অপারেশন শেষ হয়েছিল এক ঘণ্টায়, এটাই আমরা জানি। আর আমাদের অপারেশন? সবাই জানেন কখন শুরু হয়েছিল। আমরা কতটা অজ্ঞ, অদক্ষ, অনভিজ্ঞ সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

ধনী শ্রেণির ছেলেমেয়েরা নেশা করবে না, খুনি হবে না, জঙ্গি হবে না এসবই আমাদের সাধারণ ধারণা। আমাদের মগজের মাঝে যে সেটআপ আমরা করে নিয়েছি সেখানে থেকে আমরা এই কমান্ড পাই। কেন? তারা অনেক কিছুই হতে পারে ‘ইতিবাচক বা নেতিবাচক’ এটা কেন আমরা বুঝতে চাই না?  ধনীকে দিয়েই তো ধনীকে শেষ করার চেষ্টা করা হবে।

কারণ আর্টিজান বা যেকোনো তারকামানের হোটেল-রেস্তোরাঁয় ঢুকতে পারবে কেবল ধনীরাই। সেখানকার লোকজনকে হাত করতে পারবে এবং যা ইচ্ছে তাই ঘটাতে পারবে কেবল ধনীক শ্রেণি। আজকাল এই দেশে যেকোনো বিত্তশালী ব্যক্তি বা ঝুঁকিপূরণ পেশার মানুষ বডিগারড ব্যবহার করে। কিন্তু তাদের আসলে ভূমিকা কী? তাহলে ফারাজের বডি গার্ডের কিছুই হলো না কেন? আর এই রকম লোকদেখানো বডি গার্ড রেখেই বা লাভ কী?

বিস্ময়কর ব্যাপার! কিভাবে এতগুলো মানুষকে মাত্র ৬/৭ জন কুপিয়ে হত্যা করলো? কিভাবে? কারো কি সাহস হলো না পাল্টা আক্রমনের? কুপিয়ে হত্যা করা কি সহজ কথা? খুনিরা গুলি চালানো না কেন? গুলি সঞ্চয় করে রেখেছিল বাইরের আক্রমন ঠেকাবার জন্য। ভেতরেরগুলো তো হাতের মুঠায়, এই ছিল তাদের মগজে। এই রকম একটি ক্যাফেতে কোনো জোরদার নিরাপত্তাই ছিল না? নাকি তারাও সবাই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল? প্রশ্ন জাগতেই পারে।

প্রমাণের দায়িত্ব তাদের। বাংলাদেশে বেসরকারি ‘সিকিউরিটি ফোরস’ বলে গত কয়েক দশক ধরে যে একটু ব্যবসায়ী মহল তৈরি হয়েছে তাদের দক্ষতা, যোগ্যতা, সততা সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন তোলা যায়। কিন্তু এই চক্রটি এত বড় একটি চক্র যে, কেউ ই তাদেরকে কিছু বলতে সাহস পায় না। এরাই একেকটি গডফাদার। একটু মনে করার চেষ্টা করুন–প্রতিটি ফ্ল্যাট বাড়ির অবস্থা! প্রতিটি হত্যাই নিন্দনীয়, মর্মান্তিক।

কিন্তু দেশকে অস্থিতিশীল করে দেবার জন্যে একদল অতিথি (বিদেশি) একঝাঁক সম্ভাবনাময় নারী-পুরুষকে পাশবিক কায়দায় কুপিয়ে মারা?  এর নাম ধর্ম? যে শ্লোগান তারা দিয়েছিল এটা তাদের লেবাস। তারা ওই শ্লোগানের মানেও জানে না। হাই কমান্ড যা শিখিয়েছে তাই তারা আওড়েছে মাত্র! তারা বোধহীন। তাদের কোনো ধর্ম নেই। রক্তের নেশা ছাড়া আর কোনো নেশাই তাদের কাছে মূখ্য নয়। এইসব রক্ত পিশাচ পৃথিবীর যে বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়ুক বা যত বড় ঘরেই জন্ম নিক এরা পিশাচই।

এদের নষ্ট হবার পেছনে এদের পরিবার তো বটেই আমরাও কেউ কম দায়ী নই। দূতাবাস এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা আছে নানা ফাঁকে-ফোকরে। কিন্তু ধনী এলাকায় নেই কেন? রেস্তোরাঁর ক্যামেরাগুলো কার সাহায্যে খুনিদের হাতের মুঠোয় চলে গেল? ধনী এলাকা বলে সুপরিচিতি গুলশান এতটাই অরক্ষিত ছিল যা খুনিদের নজরে এসেছিল, কিন্তু এলাকার আর কারো নজরে এলো না? আশেপাশে আর কি কেউই ছিল না?

পুলিশের একটা অদ্ভুত চরিত্র! যতক্ষণ না লাশ পড়ছে ততক্ষণ সে সব কিছুই স্বাভাবিক মনে করে। এই যে অনুমানভিত্তিক একটি বাহিনী কিভাবে মোকাবিলা করবে এসব সন্ত্রাসীকে?  থানায় একটি সাধারণ ডায়রি করতে গেলেও কী যে বিড়ম্বনা সে যে যায় সেই জানে । আবার পরে সেটা নিয়েই কিছু ঘটলে তখন দোষারোপ পাবলিককে। আমরা যাবো কোথায়? পানিতে কুমির ডাঙ্গায় বাঘ! মৃতের সংখ্যা যাই হোক রাষ্ট্র যেটা ঘোষণা দেবে আমরা সেটাই মেনে নেব।

রাষ্ট্রেরও এখানে দায়িত্ব কিছুটা সত্যতা যাচাই করেই আমাদেরকে তথ্য প্রদান করা। আমরা একটি ঈর্ষাপরায়ন জাতি। যেখানে বেছে বেছে প্রমিজিং ছেলেমেয়েগুলোকে হত্যা করা হলো তারপর তাদের নিয়ে বা তাদের পরিবার নিয়ে যা ইচ্ছে তাই লেখালেখি আমাদের নীচতার পরিচায়ক? নোংরামির একটা সীমা থাকা উচিত! আর সন্ত্রাসীদের পিতৃ পরিচয় নিয়ে আমরা এত ব্যস্ত যে, অনেক কিছুই ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে এবং যাবে! এখনো সুযোগ আছে।

গোয়েন্দা সংস্থা ঠিকমত কাজ করতে পারলে আরও অনেককিছুই বের হয়ে আসবে আর গোয়েন্দা সংস্থা যাই বের করে আনুক আমাদের সবটা জানার দরকার নাই। কারণ তাদের কাজ আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আমাদেরকে প্রতি মুহূর্তে সংবাদ পরিবেশন করা নয়। তাই দেশকে সন্ত্রাস মুক্ত করতে কেবল ‘জিরো টলারেন্স’ এর ঘোষণাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সম্মিলিত আন্তরিক প্রচেষ্টা। পাশাপাশি বাহিনীর দক্ষতা বৃদ্ধি ও দেমাগকে কাজে লাগানো।

‘আমার’ শব্দটা ভুলে গিয়ে সবাই ‘আমরা’ শব্দটা হৃদয়ঙ্গম করি না কেন? এখানে আমিত্বের কিছু নাই। দেশ আমাদের কারো একক নয় বা পরিবারের নয়। আমাদের দেশকে আমাদেরই বাঁচাতে হবে। আমাদের ট্যাক্সের ১৫ % আর ভ্যাটের ১০% মোট ২৫ % টাকার মাঝে অন্তত ৫% আমাদের নিরাপত্তায় ব্যয় করুন।

দেশকে নিরাপদ রাখুন। মানুষকে ঘুমাতে দিন। বেডরুম পাহারা দেবার দরকার নাই, দেশকে পাহারা দিন– দেশের আপামর জনগণকে পাহারা দিন– দেশের অমিত সম্ভাবনাময় সম্পদ ‘মানবসম্পদ’– ‘মানুষ’কে দেশের সব মঙ্গলময় কাজে নিযুক্ত করুন। সমালোচনাকে সাধুবাদ জানান। চাটুকরকে চিনে রাখুন। একজন অকুতোভয় রাষ্ট্র নেতার কাছে তো আমরা এটাই চাই। লেখক:- মানবাধিকার ব্যাক্তিত্ব

(Visited 6 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here