ছাত্রলীগের আছে বন্দুক ছাত্রদলের সুপার গ্লু

0
181

54

এ কে এম শাহনাওয়াজ: আমাদের চলমান রাজনীতির ব্যাকরণ বোঝা খুব মুশকিল। জঙ্গি নামের সন্ত্রাসীদের নিয়ে শংকা ও উদ্বেগে কাটছে সময়। চাপের মুখে আছে সরকার। মজা লুটতে চাইছে বিএনপির মতো বিরোধী দল।

জঙ্গি প্রতিরোধে নানা আয়োজন চলছে। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘর্মাক্ত তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে। রাজনৈতিক নেতা থেকে মন্ত্রী, সুশীল সমাজের মানুষ, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিদিন জঙ্গিবাদবিরোধী প্রচারণায় ব্যস্ত।

রাজনৈতিক দলগুলো জঙ্গিবিরোধী জাতীয় ঐক্য করার প্রচারণায় একদফা যার যার মতো করে রাজনীতি করে নিচ্ছে আর তেমন একটি অবস্থায় বড় দুই রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা সরবে এবং নীরবে সন্ত্রাস চালিয়ে নিজ দলীয় নেতৃত্বের সন্ত্রাসবিরোধী ভূমিকার আন্তরিকতার বিষয়টি প্রশ্নের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে ২৭ জুলাই জঙ্গিবিরোধী প্রচারণায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।

আমরা অনেকে এ সময়ের লেখায় ও টকশোতে বলার চেষ্টা করছিলাম, পরিসংখ্যানের ধার না ধেরে জঙ্গিবাদের দায় দু-একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর অর্পণ করে প্রতিথযশা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও এর হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে একটি বিতর্কিত অবস্থানে এনে দাঁড় করানো হয়েছে। কেউ কেউ একে অনেকের অজ্ঞতা ও সরলীকরণ বলছেন; আর কেউ কেউ প্রভাবশালী কোনো পক্ষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশও বলতে চেয়েছেন।

অথচ দীর্ঘদিন থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চিহ্নিত ছাত্র সংগঠনগুলো সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আসছে। এদের নামে জঙ্গি তিলক নেই সত্যি, এরা অপকর্ম করলে আইএস নাম দিয়ে দায় স্বীকার করে না সত্যি; কিন্তু এদের কারণে ক্যাম্পাসে কম রক্ত ঝরেনি। মানবতা কম বিপন্ন হয়নি।

আমাদের এসব বক্তব্যে কেউ কর্ণপাত করত কিনা জানি না। তবে ভালো লাগল অনেকদিন পর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু তার বক্তৃতায় গলা ছেড়ে এ সত্যটি উচ্চারণ করলেন। তিনি বললেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনের ক্যাডাররা রগকাটা রাজনীতি এবং সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আসছে অনেক দিন থেকে।

স্পষ্ট করে বললেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষক জামায়াতের রুকন। যাহোক আজকের এ লেখায় এসব কলংকের তুলনামূলক বিচার করতে চাই না। আলোচনায় আনতে চাই এ সময়ের ছড়িয়ে পড়া জঙ্গিদের মূলোচ্ছেদের জন্য যখন আমরা এক হতে চাচ্ছি তখন সরকারি দলের সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগের যেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার কথা, সেখানে তারা ক্যাম্পাসে আর ক্যাম্পাসের বাইরে গুলির খই ফোটাচ্ছে।

অন্তঃর্কলহে নিজেরা নিজেদের রক্ত ঝরাচ্ছে। এভাবে জঙ্গিদের এগিয়ে চলার পথ করে দিচ্ছে যেন! আর বরাবরের মতো আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব রাজনৈতিক স্বার্থহাসিলের কথা মাথায় রেখে এসব ছাত্র নামধারী দুষ্কৃতকারীদের মূলোচ্ছেদে ভূমিকা রাখছে না। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী অদৃশ্য ইশারায় নিষ্ক্রিয় থাকছে। এ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে জঙ্গি দমনে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে সাধারণ মানুষ সন্দেহ পোষণ করলে কি দোষ দেয়া যাবে?

সবচেয়ে লক্ষণীয়, জঙ্গি উৎপাদনের দায় ঢালাওভাবে কোনো কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘাড়ে চাপানোর সুযোগে ছাত্রলীগ এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতির সুযোগ সৃষ্টির দাবি জানায়। মনে হয় অনুমতি পেলে পরদিনই ছাত্রলীগের শাখা খুলে ফেলে। যে সময় দীর্ঘ অপরাজনীতির কারণে চলমান ধারার ছাত্র রাজনীতির অবসান চাচ্ছে সাধারণ মানুষ, তখনই ছাত্রলীগের এ দাবি।

এর চেয়েও লক্ষণীয়, এ দাবি করার সম্ভবত একদিন পরই ২০ জুলাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের পদবঞ্চিত ও পদলাভকারী পক্ষের মধ্যে রাতভর বন্দুকযুদ্ধ হয়। রক্তাক্ত হয় ক্যাম্পাস। সিলেটের কারা ফটকে তাণ্ডব চালায় ছাত্রলীগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীরা মাথা ফাটায় ছাত্রলীগ নেতার। বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার সময় ছাত্রদলের সন্ত্রাস কম দেখেনি মানুষ।

এখন তো দলটির ম্রিয়মাণ দশা। এমনিতেই বাংলাদেশের প্রচলিত সংস্কৃতি অনুযায়ী, কোনো দল ক্ষমতায় থাকলে সে দলের ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসে বাঘ হয়ে যায়। আর মেনি বিড়াল হয়ে যায় কক্ষচ্যুত বিরোধী দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সরকারি দলের ডাণ্ডার সামনে অন্যরা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। তবুও নীরব সন্ত্রাস বা অপকর্ম থেকে কি বিরত থাকে? জানতাম আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে একটু বাঁকা মন্তব্য করলেও অনেক সময় আদালত অবমাননার দায় নিতে হয়।

শাস্তি ভোগ করতে হয়; কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় রাজনীতির ক্ষেত্রে বিচারের বাণী ভিন্ন খাতেও বয়ে যেতে পারে। আদালত বিএনপি নেতা তারেক রহমানকে সাজা দিলে আইনজীবী থেকে শুরু করে বিএনপি নেতারা যেভাবে এ রায়কে সরকার নিয়ন্ত্রিত রায় বলে বক্তব্য রাখলেন প্রকাশ্যে, তাতে সাধারণ মানুষ আদালত অবমাননার সংজ্ঞা নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েছে।

এর ধারাবাহিকতায় এ রায়ের প্রতিবাদে নানা কর্মসূচি দিচ্ছে বিএনপি। তেমনি এক কর্মসূচি ছিল ২৩ জুলাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথাগত কারণেই ছাত্রদলের প্রকাশ্য অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। ফলে এ ধর্মঘটের কথা কেউ মনে রাখেনি। এ দিন সকালে ক্লাস নিতে গিয়ে দেখি বিপত্তি। ছাত্রদলের ছেলেরা নাকি খুব ভোরে এসে সংগোপনে সব ক্লাসরুম, অফিস এবং শিক্ষকদের কক্ষের তালার ভেতর সুপার গ্লু দিয়ে অকেজো করে দিয়েছে।

পরে তালা ভেঙে বিশ্ববিদ্যালয় সচল করা হয়। ছাত্র ধর্মঘটের আর কোনো প্রভাব ছিল না। প্রতিদিনের মতোই ছাত্র-শিক্ষকে গমগম করে ক্যাম্পাস। ক্লাসেও পেলাম ভরপুর ছাত্র। এসব দেখে সহানুভূতির সঙ্গে বিএনপিকে নিয়ে ভাবলাম। আহা! দলটির এখন এমন মরণদশা যে এদের রাজনীতি সুপার গ্লুতে এসে ঠেকেছে। তবে ক্লাস পরীক্ষা বন্ধের মতো এও তো এক ধরনের সন্ত্রাস। বিএনপি নেতৃত্ব নিজেদের ছাত্র-সন্ত্রাস ও জামায়াতের মতো সন্ত্রাসীদের নিয়ে যখন জঙ্গিবিরোধী ঐক্য করতে চায় তখন বিষয়টি খুব পানসে হয়ে পড়ে।

এসব কারণে আমরা আমাদের ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাহীন শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বকে বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই, আপনারা যদি সত্যিই জঙ্গিবিরোধী তৎপরতায় সাফল্য পেতে চান তাহলে জনগণের মধ্যে আপনাদের প্রতি আস্থা সৃষ্টি করুন। আমার এক সহকর্মী দুঃখ করে বলছিলেন তার ছাত্র, ছাত্রলীগের এক ক্যাডার বলছিল- স্যার, শেষ পর্যন্ত আমাদের সাত খুন মাপ। কারণ দল জানে রাজনীতি করতে হলে আমাদের লাগবে। এ কারণে আমাদের সহ্য করতেই হবে।

আমরাও যারা দীর্ঘদিন ক্যাম্পাস রাজনীতি প্রত্যক্ষ করছি তারা জানি এসব কতটা সত্য। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী কতটা স্বস্তিতে আছে আমি জানি না। আমলাতন্ত্রের ব্যাপারেও একই প্রশ্ন। দলীয়করণ এতটা প্রকট যে এক ধরনের অস্বস্তি চারদিকে বিরাজমান। বর্তমান বাস্তবতায় বিএনপিকে নিয়ে খুব একটা ভাববার আছে বলে মনে করি না। একটাই ভাবনা তা হল একটি শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা আমাদের জন্য খুব প্রয়োজন ছিল।

কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথে না হেঁটে ক্ষমতা দখলের জন্য অন্ধকারে পথ চলতে গিয়ে বারবার হোঁচট খেয়েছে বিএনপি। এখন দলটির প্রতিবন্ধী দশা। উপায় না দেখে জঙ্গিবিরোধী ঐক্যে জামায়াত বন্ধুকে দূরে সরিয়ে রাখার যে কৌশলের কথা বলা হচ্ছে তাতে মানুষের মনে আস্থা ফিরবে বলে মনে হয় না। আর জামায়াতও নিজেদের চৌম্বক আকর্ষণ থেকে বিএনপিকে সরতে দেবে, সে ব্যাপারেও সন্দেহ রয়েছে।

এমন একটি বাস্তবতায় জঙ্গিবিরোধী তৎপরতায় সরকারের দিকেই মানুষ তাকিয়ে থাকবে এটিই স্বাভাবিক। সরকার পক্ষও নানা আয়োজনে এই দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করে যাচ্ছে; কিন্তু নিজ দলের ভেতরে যখন ছাত্রলীগ বন্দুক হাতে সন্ত্রাস ছড়ায়, এদের সুপথে আনার জন্য কোমল-কঠোর কোনো চেষ্টা যখন মানুষের চোখে পড়ে না তখন জনমনে হতাশা বাড়ে। মাঝে মধ্যে মনে হয়, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঐকান্তিকতা নিয়ে জঙ্গিবাদের মূলোচ্ছেদের কথা ভাবছেন- ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছেন; কিন্তু দলের ভেতর থেকে সে সহযোগিতা পাচ্ছেন কি!

আজ এমন ক্রান্তিকালে আমাদের মনে এ ধরনের প্রশ্ন উত্থাপনের কারণ রয়েছে। আওয়ামী জোট ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগ অপতৎপরতা চালিয়ে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল সাধারণ মানুষকে। তখন আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব বলে থাকতেন, এসব প্রকৃত ছাত্রলীগের কাজ নয়। দলের ভেতর ছাত্রদল-শিবির ঢুকে পড়েছে, এসব ওদেরই কাজ। তখর বড় মায়া হয়েছিল আওয়ামী লীগের দুর্দশা দেখে।

অন্য দলের অনাচারীরা ঢুকে নেতাকর্মী হয়ে গেল অথচ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতারা টেরই পেলেন না! আবার এবার ইউপি নির্বাচনের সময় পত্রপত্রিকায় দেখা গেল আওয়ামী লীগের ভেতর অনেক জামায়াতের নেতাকর্মী ঢুকে গেছেন। মনোনয়ন বাণিজ্যের পথ ধরে অনেকে আওয়ামী লীগারও হয়ে গেছেন। দলের ভেতর এসব ঝুট-ঝামেলা রেখে ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগ যদি জঙ্গিবাদ উচ্ছেদে আন্তরিকও হয়, তবুও বড় সাফল্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্বলতা জঙ্গিদের উৎসাহিত হওয়ার কারণ হতে পারে। আমরা মনে করি জঙ্গিবাদ উচ্ছেদের বর্তমান চেষ্টা ও ভূমিকা বহাল রেখে দলের ভেতরও শুদ্ধির চেষ্টা করা প্রয়োজন। রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ এখন বেশ শক্ত অবস্থানে আছে। এ সময়ও যদি নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে না পারে তাহলে আর কবে! তবে এক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী দলের ভেতর থেকে কতটা সহযোগিতা পাবেন, এটি সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। লেখক:- অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। (প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। তাই প্রকাশিত লেখার জন্য সিলেটের সংবাদ ডটকম কর্তৃপক্ষ লেখকের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।)

(Visited 10 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here