00

শাহিদ আহমদ হাতিমী: কাঁদছো কেন? লা-জওয়াব! কি হয়েছে, বল? কান্নার মাত্রা বেড়ে গেল! বুকে জড়ালাম, কপালে চুমু খেলাম! বয়সানুসারে বড়টা বলতে লাগলো হুজুর আমাগো মা নেই, বাবা নেই, তাই বলে কি ঘর বাড়িও থাকবেনা?!

কি উত্তর দেবো এ প্রশ্নের! অপার আশ্চর্য হলাম। মনেমনে মাবুদের নুসরাত চাইলাম, যাতে তাদেরকে একটু হাসাতে পারি! বলছি দুই এতীম তািলবুল ইলমের কথা। তারা নাজেরায় পড়ে রাজধানী ঢাকার মুহাম্মদপুরস্থ ইসলামিক এডুকেশন সেন্টার ও এতীমখানায়।

১ম সাময়িক পরীক্ষা শেষ, একসপ্তাহ মাদরাসা বন্ধ! যার যার মতো করে সবাই চলে যাচ্ছে মা বাবার কোলে! বাসা-বাড়ির ক্ষণস্থায়ী নীড়ে। রয়েগেছে শুধু এ দু’জন! এদের যাবার মতে জায়গাও নেই! ফুফুর কল্যাণে আমাদের ইসলামিক এডুকেশন সেন্টারে ভর্তি হয়েছিল।

আজ তাদের ফুফুও পারিবারিক কি এক কারণে আসেনি! তাই, নিঃস্বতা অনুভব করছে এবং অনাথবোধের জন্য কাঁদতেছে! নিঃস্ব না হলে, অনাত না হলে তাদের উল্লেখিত প্রশ্নের উত্তর প্রদান যে কতো কঠিন তা ভূক্তভোগিরাই বুঝবেন! কাকতলীয় একটি পাখির দিকে চোখ পড়লো। সাথে একটি বুদ্ধি মাথায় এলো।

বললাম, যাও ভালো কাপড় ছোপড় পরে রেডি হয়ে এসো! তোমাদেরকে নিয়ে বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে যাবো! এবার পিচ্চিটা কয় কোন বন্ধুর বাড়ি উস্তাদজি? জবাবে বললাম, তোমাদের প্রকৃতি বন্ধুদের বাড়ি যাবো! চলো- দেখবে, তোমাদেরকে আজ অনেক ধরনের ছোটবড় বন্ধুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো। এতেই হাসিমূখ হয়ে গেল। খুশিতে বাগবাগ অবস্থা। ইচ্ছে ছিল দিনেই এবার বাড়ি যাবো, সিলেটের পথে রওয়ানা দেবো!

কিন্তুু নিষ্পাপ এতীম এ বাচ্চাদের জন্য তা আর হলোনা, নিজেকে প্রবোধ দিলাম- হাজারোবার ত বাড়ি গেলাম, এবার না হয় একদিন পরেই যাই, তবুও নবীওয়ালা ও মহান আল্লাহ সন্তুস্ট হওয়াযোগি একটু সময় ব্যয় করে একটি কাজ করি! সাথে শিক্ষক মাওলানা সোহাইলও যেতে চাইলেন, তাঁরও মা বাবা নেই! চলুন।

নিয়ে গেলাম চিড়িয়াখানায়, ঢাকার মিরপুরস্ত বাংলাদেশের জাতীয় চিড়িয়াখানায়! বলছি আরাফাত আরমানের কথা! যাদের বয়স এখনো সাত পাড়ি দেয়নি। যাদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জে। যাত্রাপথে লেগুনা গাড়িতে এক ভদ্র মহিলা এতীমদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, ভাই এদেরকে ভালোবাসুন, আল্লাহ আপনাকে ভালবাসবেন।

যাদের ছেলেমেয়ে নেই, তাঁরা স্বভাবত বুঝেনা সন্তানের কদর! কিন্তু আপনি বুঝতে পেরেছেন, থ্যানকিউ! আমি বললাম- না বোন এটা আমার নয়, আমার মাদরাসার কিংবা মাদরাসা কর্তৃপক্ষের কল্যাণমুলক কর্মসুচির সুবাধে, ধন্যবাদটা তাদের প্রাপ্য! পর্দাশীলা মহিলা আশ্চর্য হয়ে আমার দিকে তাকালেন, নেমে পড়লেন! গালি দিলেন না দোয়া দিলেন?

আল্লাহ জানেন! গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। টিকেট ক্রয় করে চিড়িয়াখানায় প্রবেশ করলাম। একে একে পরিচয় করিয়ে দিলাম তাদেরকে প্রকৃতি বন্ধুদের সাথে। বাঘকে দেখিয়ে বললাম ইনি অনেক সাহসী, তোমাদের ‘বাঘ’ বন্ধু, এর মতো তোমাদেরকে সাহসী হতে হবে। সিংহকে দেখিয়ে বললাম ইনি তোমাদের ‘সিংহ’ বন্ধু, এর মতো তোমাদেরকে দীপ্ত হতে হবে! ময়ূরকে দেখিয়ে বললাম ইনি তোমাদের ‘ময়ূর’ বন্ধু, এর মুগ্ধপেখমের মতো তোমাদেরকেও বিশুদ্ধ বিমুগ্ধ জীবন সাঁজাতে হবে!

বককে দেখিয়ে বললাম ইনি ‘বকপাখি’ বন্ধু, এর মতো তোমাদের মনটাও সাদা করতে হবে! জিরাফকে দেখিয়ে বললাম ইনি ‘জিরাফ’ বন্ধু, এর মতো তোমাদেরকে ইলমে- যোগ্যতায় বড় হতে হবে! দোয়েলকে দেখিয়ে বললাম, ইনি আমাদের জাতীয় পাখি ‘দোয়েল’ বন্ধু, এর মতো তোমাদেরকে জাতীয় আলেম-হাফেজ হতে হবে! মসজিদের গম্বুজ দেখিয়ে বললাম এটা কোনমূখি? তারা কহিল, উপরমূখি।

বলতো উপরের দিকে কে থাকেন? আল্লাহ, সো তোমাদেরকেও আল্লাহমূখি হতে হবে! গাছের ছায়ায় সবুজ ঘাস দেখিয়ে বললাম, এগুলোর রঙ কি? নামকি? কহিল সবুজ রঙ, নাম ঘাস! ভালো লাগছে কি? জি, বহুত! তবে শোন, সবুজ পৃথিবীতে সবুজ মিনারার দেশ মদীনায় শায়িত আছেন একজন মহামানব! তোমাদের মতো তাঁরও মা বাবা ছিলোনা, ধন সম্পদ ছিলোনা! কিন্তু তিনি কখনো ভেঙ্গে পড়েননি, কেউ নেই বলেও অহেতুক কান্নাকাটি করেননি, কখনো মিথ্যা কথাও বলেননি!

আরবের লোকেরা তাকে বিশ^স্তের উপাধি স্বরূপ ‘আল আমিন’ বলে ডাকতো। আর এই সকল গুণের কারণে আল্লাহ তাঁকে অনেক ভালোবাসতেন। আল্লাহ তাঁকে তাঁর প্রিয় বন্ধু বলেছেন! তাঁকে দু’জাহানের বাদশা বানিয়েছেন! তোমরা কি তাঁর মতো বড় হতে চাও? জি, তাহলে আর অকারণে কাঁদতে পারবেনা যে? মাথানেড়ে সায় দিল! কখনো মিথ্যা বলতে পারবেনা যে?

আচ্ছা! মনযোগ দিয়ে লেখাপড়া করতে হবে যে? জি আচ্ছা! শুধুমাত্র আচ্ছা বললে হবেনা ‘দু’জাহানের বাদশা বিশ্বনবী মুহাম্মদ সঃ এর আদর্শ অনুযায়ী জীবনকে পরিচালনা করতে হবে কিন্তু? ইনশাআল্লাহ!! লেখক: সম্পাদক- পুষ্পকলি, শিক্ষক-ইসলামিক এডুকেশন সেন্টার মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

(Visited 1 times, 1 visits today)

NO COMMENTS

Leave a Reply