বিলুপ্তির পথে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ডলু বাঁশ

0
58

সিলেটের সংবাদ ডটকম ডেস্ক: মৌলভীবাজার তথা সিলেট বিভাগের শত বছরের ঐতিহ্য পিঠে-পুলির অন্যতম ‘চুঙ্গাপোড়া পিঠা’ বা ‘চুঙ্গাপিঠা’ প্রায় বিলুপ্তির পথে। শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে আগেকার দিনে গ্রামের প্রতিটি ঘরে চুঙ্গাপুড়ার আয়োজন বসলেও এখন আর এগুলো চোখে পড়ে না।

ঘরের বাহিরে শীতের রাতে খড়কুটো জ্বালিয়ে সারারাত চুঙ্গাপুড়ার দৃশ্য এখন নতুন প্রজন্মের কাছে গল্পের কাহিনী হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতীতে সারা রাত হৈ-হুল্লোড় করে চুঙ্গা পিঠা খাওয়ার মজাই ছিল আলাদা। চুঙ্গা পিঠা খাওয়ার জন্য শহর ছেড়ে অনেক লোক পরিবার নিয়ে কয়েক দিনের জন্য গ্রামের বাড়িতে চলে আসতেন।

কিন্তু এগুলো এখন প্রবীণদের কাছে অতীত স্মৃতি হয়েই টিকে আছে। প্রবীণ মুরব্বিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আগেকার দিনে শীত মৌসুমে গ্রামের বাজারে ঘন ঘন মাছের মেলাও বসতো। সেই মেলা থেকে চাহিদা অনুযায়ী দেশি-বিদেশী মাছ কিনে কিংবা হাওর-নদী হতে বড় বড় রুই, কাতলা, মৃগেল, বাউস, চিতল, বোয়াল, পাবদা, কই, মাগুর মাছ ধরে নিয়ে এসে হাল্কা মশলা দিয়ে ভেঁজে চুঙ্গাপোড়া পিঠা খাওয়া ছিলো বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের একটি অন্যতম ঐতিহ্য।

বাড়িতে মেহমান বা নতুন জামাইকে শেষ পাতে চুঙ্গাপোড়া পিঠা মাছ ভেজে আর নারিকেলের পিঠা পরিবেশন না করলে যেনো লজ্জায় মাথা কাটা যেতো। বর্তমানে সেই দিন আর নেই। চুঙ্গাপিঠা তৈরির প্রধান উপকরণ ডলু বাঁশ ও বিন্নি ধানের চাল (বিরইন ধানের চাল) সরবরাহ এখন অনেক কমে গেছে। অনেক স্থানে এখন আর আগের মতো এগুলো চাষাবাদও হয় না।

ফসলি জমিতে বাড়ি ঘর নির্মাণের কারণে কমে গেছে এর উৎপাদন। অনুসন্ধানে জানা যায়, মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার গাজীপুরের পাহাড়, জুড়ী উপজেলার চুঙ্গাবাড়ী, কমলগঞ্জের পাহাড়ী এলাকা, বড়লেখার পাথরিয়া পাহাড়, জুড়ীর লাঠিটিলা, রাজনগরসহ বিভিন্ন উপজেলার টিলায় টিলায় ও চা-বাগানের টিলায় প্রচুর ডলুবাঁশ পাওয়া যেত।

এর মধ্যে চুঙ্গাবাড়ী এক সময় প্রসিদ্ধ ছিলো ডলুবাঁশের জন্যে। অনেক আগেই বনদস্যু, ভুমিদস্যু এবং পাহাড়খেকোদের কারণে বনাঞ্চল উজাড় হয়ে যাওয়ায় হারিয়ে গেছে ডলুবাঁশ। তবে জেলার কিছু কিছু টিলায় মাঝে মধ্যে এখনও ডলুবাঁশ পাওয়া যায়। পাহাড়ে বাঁশ নেই বলে বাজারে এই ডলুবাঁশের দামও এখন বেশ চড়া। ব্যবসায়ীরা দূরবর্তী এলাকা থেকে এই ডলুবাঁশ কিনে এনে বিভিন্ন উপজেলায় নিয়ে যান বিক্রির আশায়।

এই বাঁশটি ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া জরুরী বলে মনে করছেন স্থানীয় পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। তা না হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে স্বপ্নেও এগুলোর আর খোঁজ পাওয়া যাবে না বলে মন্তব্য করেন তারা। ডলুবাঁশ ছাড়া চুঙ্গাপিঠা তৈরি করা যায় না কারণ ডলুবাশে এক ধরণের তৈলাক্ত রাসায়নিক পদার্থ আছে, যা আগুনে বাঁশের চুঙ্গাকে না পোড়াতে সাহায্য করে।

ডলুবাঁশে অত্যধিক রস থাকায় আগুনে না পুড়ে ভিতরের পিঠা আগুনের তাপে সিদ্ধ হয়। ডলুবাঁশের চুঙ্গা দিয়ে ভিন্ন স্বাদের পিঠা তৈরি করা হয়ে থাকে। কোনো কোনো জায়গায় চুঙ্গার ভেতরে বিভিন্ন চাল, দুধ, চিনি, নারিকেল ও চালের গুড়া দিয়ে পিঠা তৈরি করা হয়। পিঠা তৈরি হয়ে গেলে মোমবাতির মতো চুঙ্গা থেকে পিঠা আলাদা হয়ে যায়।

চুঙ্গাপিঠা পোড়াতে আবার প্রচুর পরিমাণে খড় (নেরা) দরকার পড়ে। এই খড়ও এখন সময়ের চাষাবাদ না করার কারণে দামও একটু বেশি। স্থানীয়রা জানান, যদি সিলেট অঞ্চলের এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে হয়, তাহলে ভুমিখেকো, পাহাড়খেকো ও জোরপূর্বক দখলদারদের হাত থেকে মৌলভীবাজার তথা সিলেটের পাহাড় গুলোকে রক্ষা করতে হবে।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here