সুনামগঞ্জের ৮/৯টি হাওর বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে

0
709

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি:: সুনামগঞ্জ জেলায় গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে সব নদ-নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে পানি বিপদসীমার ২ দশমিক ১১ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

বিভিন্ন নদীর পানি বেড়ে বাঁধ উপচে ও ভেঙে ধর্শপাশা উপজেলার ৮টি হাওরের বোরো ফসল তলিয়ে গেছে।  দুই হাজার হেক্টরের বেশি বোরো জমি তলিয়ে গেছে বলে জানা যায়।  জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জাহেদুল হক জানিয়েছেন, বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে প্রায় ১ হাজার হেক্টর এবং জলাবদ্ধতার শিকার প্রায় ১ হাজার হেক্টর বোরো জমি।

ধর্মপাশা উপজেলার ধারাম, দিরাইয়ের বরাম, তাহিরপুরের শনি ও মাটিয়ার হাওরে বাঁধ অত্যন্ত ঝুঁকিতে রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কারও দেখা পাচ্ছেন না কৃষকরা। বৃহস্পতিবার ভোর রাত ও শুক্রবার সকালে ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্র সোনারথাল, ডুবাইল, মধ্যনগর থানার মধ্যনগর মেঘনা, মরিচাউরি, শালদিঘা, চারমদানী ইউনিয়নের গুরমা, কাইলানী, আরিবন, বুড়া ছুপরি হাওরের বাঁধ ভেঙে পানিতে তলিয়ে গেছে।

হাওরের ফসল রক্ষাবাঁধ নির্মাণে জেলার বিভিন্ন হাওর পাড়ে মাইকিং করে কৃষকদের বাঁধে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছে। পানিতে ডুুবে ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের রাজাপুর, ঘোল্লা, মাহমুদপুর, মুক্তারপুর, দয়ালপুর ও আমানীপুরসহ আশপাশের সকল গ্রাম, মধ্যনগরের সদর ইউনিয়নের পাইকপাড়া, বৈঠাখালী, জমসেরপুর, নোয়াগাঁও, পিঁপড়াকান্দা, বৌলাইখালী, তেলিপাড়া গ্রাম, চামরদানী ইউনিয়নের আবিদনগর, কাদিপুর, সাদিপুর, দুগনই, কাহালা, বিশাড়া, সাজদাপুর, কামারগাঁও, নন্দীপাড়া, দরাপপুর নোয়াগাঁও ও জগন্নাথপুর, বংশিকুন্ডা ইউনিয়নের পলমাটি গ্রাম, জয়শ্রী ইউনিয়নের সরস্বতীপুর এবং তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের দুর্লভপুর গ্রামের কৃষকদের বোরো ফসল তলিয়ে গেছে।

জামালগঞ্জ উপজেলার,বেহেলী ইউনিয়নের হরিনগর,কুমড়িয়া,পুটিয়া, রাজাপুর অত্র (চার) গ্রামের ২টি ওয়ার্ডের বাথান নামক ১টি হাওর অতিবৃষ্টির কারণে ডুবু ডুবু অবস্থা এই হাওরে প্রায় ৬০০ একর জমি রয়েছে।তাই অত্র হাওরের কৃষক ভাইদের মনকে সান্তনা দেওয়ার জন্য সামর্থ অনুযায়ী ১টি মাত্র সেচ পাম্প বসানো হয়েছে।আর তাই অত্র হাওরের কৃষকেরা চিন্তায় হাহাকার করছে।

বৃহস্পতিবার ভোর রাতে দিরাই উপজেলার বরাম হাওরের ধল ও কাদিরপুর গ্রামের কাছের তুফানখালী বাঁধ ভেঙে কালনী নদীর পানি হাওরে প্রবেশ করছে। স্থানীয় লোকজন বাঁশ ও বস্তা নিয়ে এই বাঁঁধটি রক্ষার চেষ্টা করছেন। স্থানীয় তাড়ল ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল কুদ্দুছ সকালে ওই বাঁধ পরিদর্শনে গেলে তাকে ধাওয়া করে কৃষকরা। পরে পুলিশ গিয়ে তাকে রক্ষা করে।

এ ছাড়া শুক্রবার সকালে ওই বাঁধ পরিদর্শন করেছেন দিরাই-শাল্লার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ড. জয়া সেনগুপ্তা ও জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম। ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা অভিযোগ করছেন, হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ সময়মতো না করায় চৈত্র মাসেই বোরো ফসল তলিয়ে যাচ্ছে। কৃষকদের ছয় মাসের সকল কষ্ট মাত্র কয়েক ঘণ্টায় পানিতে তলিয়ে গেছে।

নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ও দুর্বল বাঁধের কারণে হুমকিতে রয়েছে জেলার দিরাই উপজেলার বরাম হাওর, জামালগঞ্জ উপজেলার পাগনা ও হালির হাওর, তাহিরপুর উপজেলার শনি ও মাটিয়ান হাওর, সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার খরচা, জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জের দেখার হাওরসহ ছোট-বড় সকল হাওরের বোরো ধান। টানা বৃষ্টিপাতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে কোনো হাওর তলিয়ে যাচ্ছে, আবার কোথাও দুর্বল বাঁধ ভেঙে ও পানি উপচে হাওর তলিয়ে যাচ্ছে।

কৃষকদের এই চরম দুর্যোগে উপজেলা প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো কর্মকর্তাকে কাছে পাচ্ছেন না কৃষকরা। ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউপি চেয়ারম্যান আমানুর রাজা চৌধুরী বলেন, পাউবোর ঠিকাদার বাঁধ নির্মাণ না করায় ডুবাইল হাওর বৃহস্পতিবার রাতে তলিয়ে গেছে। সকল ফসল কাঁচা অবস্থায় তলিয়েছে। মধ্যনগর উপজেলার চামরদানী ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান প্রভাকর তালুকদার পান্না বলেন, বাঁধ নির্মাণে পাউবো ও পিআইসির অনিয়ম-দুর্নীতির কারণেই অল্প বৃষ্টিতেই দুর্বল বাঁধ সহজে ভেঙে যাচ্ছে।

চৈত্র মাসে কোনো বাঁধ ভাঙা ও হাওর তলিয়ে যাওয়ার নজির না থাকলে শুধু অনিয়ম-দুর্নীতির কারণেই তা হচ্ছে। জগন্নাথপুর অব্যাহত বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার হাওররক্ষা বেড়িবাঁধগুলো ঝুঁকিতে পড়েছে। কৃষকরা তাদের কষ্টার্জিত ফসল রক্ষায়, বেড়িবাঁধ রক্ষায় প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কতটুকু রক্ষা করা সম্ভব হবে এ নিয়ে শঙ্কা বিরাজ করছে।

ইতোমধ্যে জলাবদ্ধতায় বিভিন্ন হাওরের কমপক্ষে ২০০ একর জমির আধাপাকা ফসল তলিয়ে গেছে। জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ সহ পাউবোর মাঠ কর্মকর্তারা মাঠে থাকলেও হাওরের বেড়িবাঁধ রক্ষায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জাহেদুল হক জানান, দুর্বল বাঁধের কারণে বৃষ্টির পানিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুটি বাঁধ ভেঙে ধর্মপাশার চন্দ্র সোনারথাল, ডুবাইল হাওর ও পিআইসির বাঁধ ভেঙে মধ্যনগরের গুরমা, কাইলানী, মেঘনা, মরিচাউরি হাওরের বাঁধ ভেঙে পানিতে তলিয়ে গেছে। বাঁধ ভেঙে প্রায় ১ হাজার হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে।

বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে প্রায় ১ হাজার হেক্টর জমিতে। বৃষ্টি বন্ধ না হওয়ায় জলাবদ্ধতার পরিমাণ বাড়ছে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আফছর উদ্দিন জানান, ধর্মপাশার চন্দ্রসোনার থাল, ঘুরমা ও দোয়ারাবাজারের দোহালিয়া, দিরাইয়ের বরাম হাওরের গাগড়াখালী ও তুফানখালী বাঁধ ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব বাঁধ রক্ষার প্রাণপণ চেষ্টা করা হচ্ছে। মধ্যনগরে যে কয়েকটি বাঁধ ভেঙে হাওর ডুবেছে, সেই বাঁধগুলো পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে নয় বলেও জানান তিনি।

জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম জানান, টানা বৃষ্টিপাতে সকল নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকছে বলে জানা গেছে। দিরাইয়ের তুফানখালী বাঁধটি রক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে। সময়মতো বাঁধ নির্মাণ না করা ও বাঁধ নির্মাণে পিআইসিদের চাহিদামতো বরাদ্দ দেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। জেলার সকল হাওরের বোরো ফসল রক্ষায় দিনরাত চেষ্টা করে যাচ্ছি।

সকল ইউএনওকে বাঁধে কঠোর নজরদারি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বাঁধে থাকতে অনুরোধ করেছেন বলেও জানান তিনি। চলতি বছর সুনামগঞ্জে বোরো ফসলের আবাদ হয়েছে ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে। ৪২টি হাওরের ফসল রক্ষায় ৫৮ কোটি টাকা ৭০ লাখ টাকার বাঁধের কাজ হচ্ছে।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জের বৃহৎ ৩৭টি হাওরসহ মোট ৪২টি হাওরে ১০ কোটি ৭৭ লাখ ব্যয়ে ২২৫টি পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) ও ৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭৬টি প্যাকেজে ঠিকাদার দিয়ে বোরো ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করছে। পিআইসির কাজ ২৮ ফেব্রুয়ারি ও ঠিকাদারের কাজ ৩১ মার্চেরমধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পিআইসির কাজ শেষ হয়নি ও ঠিকাদারের কাজ সময়মতো শেষ হয়নি।

(Visited 16 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here