হাওরে রোদন : দায়ীদের দৌরাত্ম

0
41

হাসান হামিদ: উৎপাদন ও মানব বসতির দিক থেকে বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর  দেশ। প্রাচীনকাল থেকেই গোটা বাংলা ছিল একটি কৃষিনির্ভর সমাজ। এক সময়ে  বিশ্ববাজারে সমাদৃত দ্রব্যসামগ্রী ছিল বস্তুত কৃষিভিত্তিক গ্রাম-বাংলার অবদান।

প্রাচীনকালে, এমনকি মধ্যযুগেও কৃষকশ্রেণী ও শাসকশ্রেণীকে পৃথক করার মতো কোনো প্রতিষ্ঠিত  মধ্যবিত্ত শ্রেণি ছিল না। এমন কোনো শক্তিশালী শহুরে শ্রেণিও তখন ছিল না, যাদের সামাজিক অবস্থান দ্বারা জনগণকে গ্রামীণ ও শহুরে এবং ধনী ও দরিদ্র হিসেবে শ্রেণিবিভক্ত করা যেত।

ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানিদের মতে, তখন জনসাধারণ স্বনির্ভর ও স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামে বসবাস করত, যদিও তারা সেকালে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারতে বিদ্যমান সমাজের অনুরূপ স্বশাসিত সমাজের অস্তিত্ব বাংলায় ছিল বলে স্বীকার করেন না।

আমাদের এই কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষি আর কৃষক কেন এত অবহেলিত তা আমার মাথায় ধরে না। বিশাল জনবহুল এই দেশ যদি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ না হতে পারে তবে ভবিষ্যতে কি হবে তা এখনই অনুমান করা যায়। আর দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে  সুনামগঞ্জের বোরো ফসল গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

কিন্তু হাওরের বেড়িবাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম হয়, আর সেসব দেখার কেউ নেই। এবছর ধানের দানা আসার আগেই জেলার ১১ উপজেলার প্রায় সব কয়টি হাওরের ফসল ডুবে যাওয়ায় দুর্ভোগ-দুর্দশায় পড়েছেন জেলার ১৫ লাখ কৃষক। দিশেহারা কৃষকদের কেউ বাঁধ রক্ষায় ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দিন-রাত বাঁধেই কাটাচ্ছেন, কেউ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছেন, আবার কেউ কেউ হাওরপাড়ে বসে আফসোস করছেন।

এক ফসলি জেলা সুনামগঞ্জের কৃষকদের বাঁচার সকল অবলম্বন হাওরকে ঘিরে। প্রতিবছরের মতো এবারও বাঁধ নির্মাণ করার নামে পিআইসির মাধ্যমে পাউবো পুকুরচুরি করেছে। ফলে জেলার হাওরগুলোর বাঁধরক্ষার কাজ সময়মতো শুরু না করায়, ঠিকমতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়াতে আজকের এই পরিণতি। কে এসবের জন্য দায়ী তা সবাই জানে।

কিন্তু আর কতোদিন? কেনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের এই খাত নিয়ে এমন অবহেলা? কেনো আজ অভুক্ত থাকার দৃশ্য ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে নিরাপরাধ কৃষকের স্বপ্নে টানা জীবন তারে। জানা গেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ড হাওরগুলোর বাঁধরক্ষার কাজ দুইভাবে করে থাকে।  বড় বাঁধগুলো স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রকল্প করে নির্মাণ করা হয়।

বেড়িবাঁধগুলো ঠিকাদারদের মাধ্যমে নির্মাণ হয়ে থাকে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুর্নীতি ও অনিয়ম, অন্যদিকে ঠিকাদাররা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাঁধ নির্মাণে ব্যর্থ হওয়ায় এবং কোথাও কোথাও নামমাত্র কাজ করে বরাদ্দের টাকা ভাগাভাগি করায় কৃষকের  ফসল তলিয়ে যায়। প্রতিবছর হাওর রক্ষা বাঁধ শুরুর আগে পাউবো’র মাঠ কর্মকর্তারা তাদের নিজেদের মতো হাওর পরিদর্শন করে প্রাক্কলন প্রস্তুত করেন।

কোথায় কাজ হবে, কোন প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হবে তা নির্ধারণ করে জেলা কার্যালয় থেকে প্রধান অফিসে প্রেরণ করা হয়। প্রধান অফিস কাটছাঁট করে বরাদ্দ নির্ধারণ করে এবং  জেলা কার্যালয়কে দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কার্যাদেশ প্রদান করেন এবং পিআইসি গঠনের জন্য অনুমতি প্রদান করেন।

নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি পিআইসিতে মাননীয় সংসদ সদস্য কর্তৃক তিন জন সদস্য মনোনীত করা হয় এবং উপজেলা  চেয়ারম্যান কর্তৃক একজন সদস্য মনোনীত করা হয়। মূলত এই সদস্য মনোনয়নকে কেন্দ্র করে মাঠপর্যায়ে দ্বন্দ্ব, সংঘাত, লবিং, গ্রুপিং দেখা দেয়। পাউবো কর্তৃপক্ষ এই সদস্য মনোনয়নকে কেন্দ্র করে ইউপি সদস্য ও মনোনীত ব্যক্তিদের সমন্বয় করতে অনেক সময় পার করে দেয়। এই সুযোগে সুবিধাভোগীরা কলাকৌশলে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়।

তারা প্রভাব বিস্তার করে কমিটির মূল দায়িত্ব, কর্তব্যের  ধারে-কাছে না গিয়ে প্রকল্প থেকে কিভাবে আর্থিক সুবিধা নেওয়া যায় তার ধান্ধায় থাকে। যথাসময়ে কমিটিকে কাজ বুঝিয়ে না দিতে পারা এবং সময়মতো কার্যাদেশ প্রদান করতে প্রতিবছরই পাউবো কর্মকর্তারা ব্যর্থ হয়। আর তার পরিণতিতে আজকের এই অবস্থা। জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে জেলা কমিটি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে উপজেলা কমিটি থাকলেও কাজের বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি মূল্যায়নে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।

কোন কমিটিকে কাজের বিল দেয়া হবে,  কারা কতটুকু কাজ করেছে তা যদি অন্তত ইউএনওদের স্বাক্ষরে অনুমোদনের ব্যবস্থা থাকতো, তাহলে সেখানে কিছুটা হলেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হতো। পাউবো উপজেলা বা জেলা কমিটির কোনো অনুমোদন না নিয়েই নিজেরা নিজেদের মতো পরিশোধ করে।

নিজেরা প্রকল্প কমিটির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কমিশনের বেড়াজালে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের বন্দি করে। এভাবে যখন কাজ শুরু হয়, তখন তাড়াহুড়ো  করে টেকসই কাজ না করে কমিটির সভাপতি ও সম্পাদককে বিলের পেছনে দৌড়তে হয়। এভাবে কোনো যথাযথ তদারকি আর সমন্বয়হীনতার কারণে প্রতিবছর দুর্ভোগ নেমে আসে অসহায় কৃষকদের মাঝে।

এসব কাজ করুক আর না করুক পাউবো কর্তৃপক্ষ সহ মধ্যসত্বভোগীদের চাহিদা পূরণে ব্যস্ত থাকতে হয় ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের। এভাবে কোনো যথাযথ তদারকি আর সমন্বয়হীনতার কারণে প্রতিবছর দুর্ভোগ নেমে আসে অসহায় কৃষকদের মাঝে। কৃষকরা সব হারিয়েও হয়তো আন্দোলনে নামবে না। তবে আমাদের মনে রাখা দরকার, বাংলার কৃষকরা দুর্বল নয়।

উনিশ শতকের সত্তরের দশক ও পরবর্তীকালের কৃষক আন্দোলনের সাংগঠনিক কাঠামো ও কর্মতৎপরতার কথা আমরা জানি। কৃষকদের অব্যাহত আন্দোলন এবং তাদের সাংগঠনিক কাঠামোর পরিবর্তন ঔপনিবেশিক সরকারকে সেসময় উদ্বিগ্ন করে তোলে। সরকার উপলব্ধি করে, কৃষকদের দাবিদাওয়া পূরণ না করলে, অচিরেই সরকারের বিরুদ্ধে কৃষক বিদ্রোহ দেখা দেবে।

ফলত সরকার ১৮৮৫ সালের বাংলার প্রজাস্বত্ব আইন দ্বারা তাদের অধিকার  অনেকাংশে প্রতিষ্ঠিত করে। উনিশ শতকের ঘটনাবলি বাংলার কৃষকদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থার মৌলিক পরিবর্তন ঘটায়। শহরভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলির কৃষক-শাখা অতঃপর কৃষকদের স্বার্থরক্ষার আন্দোলন শুরু করে। নির্বাচনের রাজনীতিতে কৃষকেরা তাদের নিছক সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণেও একটি নিয়ামক শক্তি হয়ে ওঠে।

ভারত বিভাগের আগে কৃষক আন্দোলনগুলিতে স্বভাবতই সাম্প্রদায়িকতার অনুপ্রবেশ ঘটে। কিশোরগঞ্জ ও অন্যান্য স্থানে কৃষক আন্দোলনে তারই প্রমাণ পাওয়া যায়। বঙ্গভঙ্গের অব্যবহিত পূর্বে  তেভাগা,  নানকার, টঙ্ক প্রভৃতি সকল আন্দোলনই ছিল বহিরাগত ভাবধারায় প্রভাবিত। এ পর্যায়ে বামপন্থি নেতৃত্বের দ্বারা কৃষকদের আদর্শ ও রণকৌশল নির্ধারিত হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগ এবং ১৯৫১ সালে পূর্ববাংলার জমিদারি প্রথা বাতিল হওয়ার পর কৃষক আন্দোলনের আরও চরিত্রগত পরিবর্তন ঘটে।

ভূমিসংস্কার ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ এবং গ্রামীণ সমাজের রাজনীতিকরণের মাধ্যমে কৃষকদের অভাব অভিযোগ প্রশমনের রাষ্ট্রীয় নীতি কৃষক আন্দোলনের চিরায়ত রূপকে একটি অতীত ঘটনায় পর্যবসিত করেছে।

একজন কৃষক তার ফসলের গল্প বলে যে আনন্দ পান, আর কিছুতে তিনি তা পান না। কৃষক ফসল ফলান বলেই আমরা তা খেয়ে জীবনযাপন করি। কৃষক বাঁচলে দেশের মানুষ ভালো থাকবে। তাই নীতিমালা সংশোধন করে বাস্তবসম্মত প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে মন্ত্রণালয়কে ভাবতে হবে।

কোন প্রক্রিয়ায় কাজ টেকসই হবে, কোন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের পাশাপাশি মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন সুরক্ষিত থাকবে তা ঠিক করা প্রয়োজন। হাওর বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পরামর্শ করে স্থায়ী ও টেকসই সমাধান করার ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষকের জন্য বরাদ্দের অংশটুকু নিয়ে যেনো আর লুটপাটের মহোৎসব না হয়। (লেখক:- গবেষক সদস্য, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here