হাসান হামিদ: আমরা যারা ঢাকায় থাকি, তারা একটা ব্যাপার ভালোই জানি; বর্ষা এলেই এখানে এক অজানা কারণে প্রচুর রাস্তা খুঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়। রাস্তা সংস্কারের কাজ হয়। ভালো কথা। কিন্তু সেটা এই বর্ষা এলেই শুধু কেনো!

অন্য ঋতুতে রাস্তার কাজ করা নিষেধ বলে তো আমাদের জানা নেই। গত কয়েক বছর ধরেই দেখছি। বর্ষা এলেই ঢাকার রাস্তা মেরামত শুরু হয়। আর তাতে মানুষের সীমাহীন ভোগান্তি বাড়ে। প্রশ্ন হলো, একই রাস্তা প্রতিবছর কেনো ঠিক করতে হবে?

রাস্তায় কর্মরত থাকা লোককে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি, মাত্র এক বছর আগে যে রাস্তা মেরামত করা হয়েছে, বছর না ঘুরতেই সড়কটি এখন খানাখন্দে ভরে গেছে। পত্রিকা মারফত জানা যায়,  বেশিরভাগ কাজ হয় অত্যন্ত নিম্নমানের।

সংস্কারকাজে মোট ব্যয়ের ৫০ শতাংশই হয় কর্মকর্তা আর স্থানীয় প্রভাবশালীদের মধ্যে ভাগাভাগি। কিন্তু মেরামতের কিছুদিন পরই অধিকাংশ সড়ক ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে।

এভাবে রাস্তা মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকা প্রতি বছরই লুটপাট হচ্ছে। প্রতিনিয়ত ঢাকা শহরে বিভিন্ন রাস্তার নিম্নমানের কাজের ফলে বাড়ছে ব্যয়, ঝুঁকি ও জনদুর্ভোগ। পত্রিকা পড়ে জানতে পেরেছি, অধিকাংশ নির্মাণ ও সংস্কার কাজের ক্ষেত্রে বরাদ্দ করা অর্থের গড়ে ৩৫ শতাংশই ব্যয় হয় ঘাটে ঘাটে ঘুষ আর চাঁদায়। আবার এক একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে ঘুষ ও চাঁদা আদায়ের ধরনও পৃথক।

ফলে ঢাকায় নির্মাণকাজের ৫০ শতাংশই তছনছ হয়ে যায়। বাকি টাকায় কাজ হয় জোড়াতালি দিয়ে। প্রতি বছর ঢাকার জন্য প্রায় ৫০০ কোটি টাকা এবং সারাদেশের সড়ক সংস্কারের জন্য বিভিন্ন সংস্থাকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু নিম্নমানের কাজের জন্য এর ৫০-৬০ শতাংশই অপচয় হচ্ছে। এসব সংস্কারকাজ করায় এলজিইডি।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের আওতায় যেসব সংস্কারের কাজ হয় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ খুব কম। রাস্তা নির্মাণ এবং সংস্কার কাজের দুটি ধরন আছে। একটি হচ্ছে তাৎক্ষণিক সংস্কারকাজ। কোনো সড়ক সংস্কার হচ্ছে না- এমন খবর পত্রিকায় উঠলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে জরুরি সংস্কারকাজ করা হয়। সরকারি পদস্থ কর্মকর্তারাও অনেক সময় হঠাৎ পরিদর্শনে গিয়ে কোনো ভাঙা সড়ক দেখলে জরুরি মেরামতের পরামর্শ দেন।

এ ধরনের জরুরি মেরামত কাজে সড়ক ও জনপথের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী তালিকাভুক্ত কোনো একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত সংস্কারকাজটি করতে বলেন নিজের মুখ রক্ষার স্বার্থে। এ ধরনের কাজের জন্য স্থানীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অলিখিত সমঝোতা আছে। পর্যায়ক্রমে তারা এ ধরনের কাজ করে দেয়। নির্বাহী প্রকৌশলীর অনুরোধে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিজের দায়িত্বেই জরুরি সংস্কার করে।

এরপর নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়ম অনুযায়ী বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। অলিখিত সমঝোতার কারণে যে প্রতিষ্ঠান আগেই কাজ করেছে, সেটি ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নেয় না। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রাক্কলন ব্যয় নির্ধারণের জন্য ব্যয় বরাদ্দের ৩ শতাংশ নির্বাহী প্রকৌশলীকে, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীকে ৬ শতাংশ, স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক প্রভাবশালী কেউ থাকলে তাকেও ৬ শতাংশ দিতে হয়।

টেন্ডার শেষ হলে শুরু হয় বিল তৈরির কাজ। বিল তৈরির সময় তিন ধাপে কর্মকর্তাদের আরও ১৫ শতাংশ দিতে হয়। ঠিকাদার প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ অতিরিক্ত বিল করেন। সব মিলিয়ে ঘুষ আর ভাগাভাগিতে ৪০ শতাংশ ব্যয় হয়। এর বাইরে তাৎক্ষণিক কাজে আগেই ঠিকাদার নিজের তহবিল থেকে ব্যয় করার কারণে যে ধরনের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করার কথা তার চেয়ে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়।

প্রতি বর্ষার আগে ঢাকায় সড়ক সংস্কারের কাজ করা হয়, বর্ষায় সড়ক ধুয়ে আবার চলাচলের অনুপযোগী হয়, এরপর জনদুর্ভোগ চলে কিছুদিন, তারপর বর্ষার আগে আগে আবারও সংস্কারকাজ চলে। কর্মকর্তারা প্রভাবমুক্ত থেকে দায়িত্ব পালন করলে এবং প্রকল্প এলাকায় বাস্তবে কী কাজ হচ্ছে তা শীর্ষ পর্যায় থেকে নিয়মিত তদারকির বিষয়টি নিশ্চিত করা গেলে অবশ্যই সরকারি কাজের মান রক্ষা করা সম্ভব।

আমরা ঢাকায় বসবাস করা অনেকে মনে করি ঢাকার সমস্যা হাজার ছাড়িয়ে যাবে। আর এভাবেই চলবে। এ আর এমন কী ! কিন্তু আমরা চাই সবকিছু ঠিকমতো হবে। এভাবে স্বস্তির হবে আমাদের নগরী। (লেখক- গবেষক)

NO COMMENTS

Leave a Reply