হাসান হামিদ: ছোট-বড় রোগ-বালাই নিয়ে আমার আত্মীয়, পরিজন বা পরিচিত কেউ ঢাকায় এলে আমার সাথে অনেকেরই যোগাযোগ হয়। আমি আমার এই সামান্য জীবনে  কতদিন কতরাত বিভিন্ন ক্লিনিক আর হাসপাতালে কাটিয়েছি, তার হিসেব রাখলে তালিকাটা বেশ লম্বাই হতো।

আর সেই সুবাধে অন্তত ঢাকার অনেকগুলো হাসপাতাল সম্পর্কে আমার ধারণা বেশ স্পষ্ট। মাঝে মাঝে মনে হতো; ডাক্তাররা বোধ হয় তাদেরকেই সেবা দেন বা দিতে রাজি থাকেন, যাদের টাকা-পয়সা আছে অথবা যুদ্ধ করে যারা অধিকারটুকু নিতে জানেন।

বিনা যুদ্ধে আমাদের দেশে এখন আর সেবা খুব একটা মিলে না। দুয়েকটি ব্যতিক্রম থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুঃখজনক পরিস্থিতি সামাল দিতে হয় এ দেশের অসহায় গরীব মানুষগুলোর। নির্দিষ্ট ফি দিতে না পারলে, নির্ধারিত ক্লিনিকে টেস্ট-ফেস্ট না করাতে পারলে আর অসীম ধৈর্য ধরে এসব যুদ্ধ করার মানসিকতা না থাকলে, ডাক্তার সেবা দিতে এক চুলও নড়বে বলে মনে হয় না।

কী কষ্ট! স্কুলে থাকতেই পড়েছি, জনসাধারণের মৌল মানবিক চাহিদাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো স্বাস্থ্য সেবা বা চিকিৎসা। সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদে অনুযায়ী, জনসাধারণের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। আমরা সরকার তথা রাষ্ট্রের কাছে প্রকৃত  স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার অধিকার রাখি।

কিন্তু জনসাধারণের জন্য সরকারের প্রদত্ত স্বাস্থ্য সেবা এখনো অপ্রতুল। অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৬ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা ৩৬টি, কমিউনিটি ক্লিনিকের সংখ্যা ১৩, ১৩৬টি, স্থুল জন্মহার (প্রতি হাজারে) ১৮.২, স্থুল মৃত্যুহার (প্রতি হাজারে) ৫.২ জন, প্রত্যাশিত গড় আয়ু ৭০.৭ বছর, জন প্রতি ডাক্তারের সংখ্যা ২১২৯ জন, মাতৃমৃত্যুহার ১.৯৩%, শিশু মৃত্যু হার (১ বছরের কম প্রতি হাজারে) ৩০ জন, শিশু মৃত্যু হার (৫ বছরের কম প্রতি হাজারে) ৩৮ জন।

এবার ডাক্তারদের অবস্থা নিয়ে একটু বলি। অনুসন্ধানে জানা গেছে,  ২০১০ সালে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) থেকে রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত চিকিৎসকের সংখ্যা ছিল মাত্র  ১৯১৫ জন।  পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে ২০১১ সালে  ৩৬৭২ জন,  ২০১২ সালে ৩১৪৯ জন, ২০১৩ সালে ৫৪১০ জন, ২০১৪ সালে  ৪৯০১ জন ও ২০১৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে সাড়ে পাঁচহাজার  জন রেজিস্ট্রেশন করেছে।

গত ছয়বছরে প্রায় ২৫ হাজারের বেশি চিকিৎসক পাস করে বের হয়েছে। দিনকে দিন পাসকৃত চিকিৎসকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।  তবে দেশে চিকিৎসকের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধির তথ্য  আশাব্যঞ্জক হলেও পাসকৃত চিকিৎসকদের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।  বাংলাদেশে এখন আর ভোগান্তি ছাড়া কোথাও চিকিৎসা মেলে না।

ডাক্তার ঠিকমত না পাওয়ার ভোগান্তি, নার্স ও স্টাফদের দুর্ব্যবহারের ভোগান্তিসহ হরেক রকম ভোগান্তির কবলে পড়তে হচ্ছে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে যেয়ে রোগীদের। সরকারি হাসপাতালগুলোর এই বেহাল দশার কারণে অনেক রোগী ভালো সেবার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে ধর্ণা দিচ্ছেন। কিন্তু সেখানেও গলাকাটা ফি, এই টেস্ট-ওই টেস্ট দিয়ে ডাক্তাররা নাজেহাল করে ছাড়ছেন রোগীদের।

তারপরও মিলছে না সঠিক চিকিৎসা। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এমন দশা মানুষকে বিদেশমুখী করেছে। অর্থবিত্তের মালিকরা সামান্য প্রয়োজনেই ছুটে যান বিদেশের হাসপাতালগুলোতে। এভাবে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার, বছরে ১০ লাখেরও বেশি রোগী চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাচ্ছেন বলে এক হিসাবে জানা গেছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল-বিএমডিসি’র তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে রেজিস্টার্ড এমবিবিএস ডাক্তারের সংখ্যা ৭৫ হাজার। যারা সঠিকভাবে চিকিৎসা সেবা দিলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হতো বলে মনে করেন অনেকে। কিন্তু বাস্তবতা পুরো বিপরীত। সংবিধানের ১৯ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের সুযোগ-সমঝোতা বিধান নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব ও কর্তব্য। দেশের ১৬ কোটি ৪৪ লাখ মানুষের মধ্যে বেশির ভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে।

কিন্তু গ্রামের নিরীহ জনসাধারণের সঠিক চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য সরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নাই। পত্রিকা মারফত জানতে পারি, এখনো দেশের ৬৪টি জেলা শহরের বেশির ভাগ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল নাই। আর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ক্লিনিকগুলোর অবস্থা আরো নাজুক।

এসব হাসপাতালে কোথাও একজন এমবিবিএস চিকিৎসক নাই, আবার কোন হাসপাতালে একাধিক এমবিবিএস কর্মরত। যেসব হাসপাতালে এমবিবিএস নাই সেখানে চিকিৎসা সহকারী ও ওয়ার্ডবয় জনসাধারণের স্বাস্থ্য সেবার একমাত্র ভরসা। জেলা সদর ও উপজেলার বেশির ভাগ হাসপাতালে এক্স-রে মেশিন, ডেন্টাল যন্ত্রপাতি, প্যাথলোজিষ্ট যন্ত্রপাতি, অর্টি বিভাগের যন্ত্রপাতি সহ মূল্যবাস চিকিৎসা সামগ্রী ব্যবহারের অভাবে অকেজো হয়ে পড়ছে।

হাসপাতালে সাধারণ মানুষ ওই সমস্ত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই সুযোগে দেশজুড়ে গড়ে উঠেছে সরকার অনুমোদিত ও অনুমোদনহীন অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার। রোগীর জন্য অধিক ব্যয় সাপেক্ষ বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে নিম্ন আয়ের মানুষ সঠিক সেবা পাচ্ছে না বরং সেবার নামে অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অধিক অর্থ আদায়, প্রতারণা, ভুল চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে কার্যক্রম চলছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাবে, দেশে বৈধ ২ হাজার ৬০৮টি আর অবৈধ আছে ৫ হাজার ১শত ২২টি স্বাস্থ্য কেন্দ্র। এসব স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসা ব্যবসার শিকার হচ্ছেন অসহায় রোগীরা। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট আইন বাস্তবায়নের অভাব। ১৯৮২ সালের অধ্যাদেশ ৩-এর ধারা অনুযায়ী ফি নেয় না কেউ।

আইনে উল্লেখিত ফি’র তুলনায় শতগুণ, কোন কোন ক্ষেত্রে কয়েক হাজারগুণ বেশি নেয়া হচ্ছে। সরকারপন্থী চিকিৎসক নেতাদের বিরোধিতা ও সরকারের সদিচ্ছার অভাবে যুগোপযোগী আইন হচ্ছে না। অনেকে বেসরকারি ও সরকারি স্বাস্থ্য সেবায় নৈরাজ্যের জন্য সরকারকে দায়ী করেন। তাই জাতীয় স্বার্থে এ সংক্রান্ত আইন বাস্তবায়ন ও সেবা নিশ্চিত করতে সরকার সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগকে আরো তৎপর হওয়া জরুরী।

দেশের বেশির ভাগ চিকিৎসকের বাণিজ্যিক মন মানসিকতার প্রবণতা থাকায় সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে সঠিক চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে না। এ সুযোগে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক বা স্থানীয় কোন হাতুরে অনভিজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা সেবার জন্য জনসাধারণ ঝুঁকে পড়েন। এসব প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে সাধারণ রোগীরা চিকিৎসকের নামী-দামী ডিগ্রি দেখে চিকিৎসা নিতে গিয়ে বিপাকে পড়েন।

আর প্রতিষ্ঠানসমুহ গ্রামের সহজ সরল রোগীর কাছে ইচ্ছামতো ফি বাকিয়ে নেন। একই সাথে প্যাথলজি টেস্টের নামেও চলে কমিশন বাণিজ্য। তারা রোগীকে প্যাথলজি পরীক্ষার জন্য লম্বা স্লিপ দিয়ে মনোনীত ক্লিনিক কিংবা ল্যাবরেটরি থেকে পরীক্ষা করার জন্য পরামর্শ দেন। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্যাথলজি ল্যাবরেটরি থেকে পরীক্ষা না করালে চিকিৎসক রোগী দেখেন না।

মূলত ওই সব চিকিৎসকরা রোগীদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত প্রতারণা করছে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী অপরাধীকে তার প্রাপ্য শাস্তির আওতায় আনার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হলে অন্যরা নিয়মের ব্যতয় ঘটাতে সাহস পাবে না। মাতৃমৃত্যু হার কমানোর জন্য দূর্গম চর ও হাওড় এবং পল্লী অঞ্চলে প্রশিক্ষিত ধাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারীর জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

বিশেষ করে পল্লী, হাওড় অঞ্চলে সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ক্লিনিক সমূহে এমবিবিএস চিকিৎসকরা যেন থাকতে চান; সেই জন্য তাঁদের পৃথক ভাতা প্রদানের বিষয়টি চালু করলে সুফল পাওয়া যেতে পারে। এছাড়া বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক শুধুশহর কেন্দ্রিক নয় বরং সরকারি ঋণ সহায়তার মাধ্যমে পল্লী অঞ্চলে এলাকা ভিত্তিক স্থাপনের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আদেশ অনুযায়ী নির্ধারিত ফি যুগোপযোগী ও কার্যকর করতে হবে। নতুন আইনের মাধ্যমে চিকিৎসকদের ফি একটা কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। দেশে চিকিৎসকদের ডিগ্রী নিয়ন্ত্রণকারী একমাত্র প্রতিষ্ঠান বিএমডিসিকে আরো তৎপর হতে হবে। ভুয়া চিকিৎসকদের দৌরাত্য নিয়ন্ত্রণে যথাযথ আইন ও চিকিৎসকদের কার্যক্রম দেখার জন্য পর্যাপ্ত জনবল সহ আইনের বাস্তবায়ন অত্যন্ত প্রয়োজন। চিকিৎসা সেবা পেতে আমাদের যেনো যুদ্ধ করতে না হয়! (লেখক:- গবেষক সদস্য, জাতীয় গ্রন্ত্রকেন্দ্র)

(Visited 1 times, 1 visits today)

NO COMMENTS

Leave a Reply