হাসান হামিদ: দশচক্র একটি বিশেষ্য পদ; যার অর্থ বহুজনের ষড়যন্ত্র বা কুমন্ত্রণা। আর ভগবানের পরিচয় সম্পর্কে বিষ্ণুপুরাণে বলা হয়েছে, “যিনি পরম ঐশ্বর্য, বীর্য, যশ, শ্রী, জ্ঞান ও বৈরাগ্য গুনযুক্ত তিনিই ভগবান”৷ দশচক্রে মানে বহুজনের চক্রান্তের ফলে ঈশ্বরকেও ভূত বলে প্রতিপন্ন করা যায়।

তবে সবক্ষেত্রে এটি কিন্তু হয় না। এখন আর সেই যুগ নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর ও ভারতের সাথে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ‘শেখ হাসিনা দেশ বিক্রি করে দিচ্ছেন’ বলে  বক্তব্য দিয়েছেন।

তার বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে, তিনি চুক্তির বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবগত নন; এমনকি চুক্তির শিরোনামগুলোও পড়ে দেখেননি। কোন চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ বিঘ্নিত হলো বা কোন চুক্তিতে দেশ বিক্রি হলো, তাও স্পষ্ট করতে পারেননি তিনি।

তিনি ভেবেছেন, তার এই প্রচার-চক্রে মানুষ চুক্তি সম্পর্কে ভুল-টুল বুঝে ক্ষেপে যাবে। দশচক্রে এতো সহজে এখন আর কাউকে ভূত বানানো যায় না, এটা বিএনপি চেয়ারপারসন কি বুঝেন?  লেখার শুরুতে ‘দশচক্রে ভগবান ভূত’ প্রবচনের সাথে প্রচলিত কাহিনীটি বলে নিই।

একদা রাজার দরবারে ভগবান নামের এক ব্যক্তি চাকরি করতেন। রাজা ভগবান নামের এই লোকটিকে খুব আদর করতেন। এটা সহ্য করতে না পেরে অন্যরা বুদ্ধি বের করে কীভাবে ভগবানকে রাজার নিকট ভুল ভাবে প্রচার করা যায়। তারা প্রচার করতে থাকে যে, ভগবান মারা গেছে। দশ জনে একই কথা বলার কারণে রাজাও মনে করলেন, ভগবান সত্যি তাহলে মারা গেছে।

কিন্তু পরদিন রাজা দরবারে ভগবানকে দেখে রাজা অন্যদেরকে বলেন, এই যে ভগবান। কিন্তু সবাই তখন বলে যে, এটা ভগবান নয় মহারাজ, ভগবান মরে এখন ভূত হয়ে এসেছে। রাজা তারপর ভাবলেন, আহা! ভগবান তাহলে মরে ভূত হয়েই এসেছে। এভাবে অপপ্রচার আর চক্রান্তের ফলেই ভগবান নামের ব্যক্তিটি ভূত বলে পরিগণিত হয়েছিল।

কিন্তু এখন সেই যুগ কি আছে আর? মানুষ কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা তা কিছুটা হলেও বুঝে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার জন্য দেশের সবকিছু বিক্রি করে দিচ্ছে বলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যে অভিযোগ  করেছেন,  তা তার অযোগ্যতাকেই প্রমাণ করেছে। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, এক অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারপারসন  বলেন, ‘হাসিনার আজীবন ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন।

এ দেশের সে কিছুই রাখেনি, সবই বিক্রি করেছে। আরও বোধহয় বাকি যেটা আছে, সেটাও দেশ বিক্রি করে আসছে।’ একজন জাতীয় নেতার এ ধরনের বক্তব্য কতোটুকু যুক্তিযুক্ত তা ভাবার বিষয়।  পিছনে তাকালে ইতিহাস বলে, বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে খালেদা জিয়া চীনের সঙ্গে সামরিক চুক্তি করেছিলেন। তার মানে এই নয়, চীনের কাছে বাংলাদেশ বিক্রি হয়ে গিয়েছিলো।

তাছাড়া ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি স্বাক্ষর হবার আগে-পরে বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর হলে, ফেনী পর্যন্ত ভারতের দখলে চলে যাবে’। কিন্তু বাস্তবে আসলে কী হয়েছে? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোনো গোপন চুক্তি করেননি। সংবিধানের ১৪৫(ক) ধারা অনুযায়ী সরকার চুক্তি করে থাকে।

আর চুক্তি করার পরে খবরগুলো গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়ে থাকে। পত্রিকা পড়ে জানতে পেরেছি, ২০১৫ সালের জুন মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের সময় পর্যন্ত ভারতের সাথে বাংলাদেশের ৮৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক ছিল। গত ৮ এপ্রিল ২০১৭ দিল্লীতে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে আরো অনেকগুলো চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

গণমাধ্যমে ইতিমধ্যেই চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকগুলি সম্পর্কে খবর এসেছে। আর আমরা তা জানি। তবে এটা সত্য, তিস্তার পানি সমস্যার সমাধানে এবার কোনো সমঝোতা হয়নি। তিস্তার পানি নিয়ে এখনও জটিলতা রয়েছে। তাই বলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কিন্তু তিস্তার পানির দাবি ছেড়ে দেননি। বরং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তিস্তার পানি দাবি আরও জোরালোভাবেই তুলে ধরেন।

একই সাথে তিনি ভারত-বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানির প্রবাহ নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানও জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন বলে আমরা খবরে পড়েছি। ভারত আমাদের প্রতিবেশী। আসলে প্রতিবেশীর সাথে ঝগড়া বাঁধিয়ে রেখে কেউই শান্তিতে থাকতে পারে না। আর প্রতিবেশীর সাথে অনেক সমস্যাই থাকতে পারে।

একটি সমস্যার সমাধান হচ্ছে না বলে, বাকি সমস্যার সমাধান করবো না, এটা কোনো যুক্তির কথা হতে পারে না। যে সমস্যাগুলির সমাধান সম্ভব তা সমাধানের মাধ্যমে বাকি সমস্যাগুলি সমাধানের পথে হাঁটতে হবে। তাহলে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি হবে। সবশেষে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কাছে কিছু প্রশ্ন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত কোন চুক্তিটি দেশের স্বার্থ বিরোধী?

কোনটিতে দেশ বিক্রি হয়েছে?  কোনটিতে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হয়েছে? দয়া করে জনগণের কাছে পরিষ্কার করুন। আর সেই সাথে মনে রাখবেন, মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ কেউই বিক্রি করতে পারবে না, কখনোই না। লেখক: গবেষক সদস্য, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র

প্রকাশিত লেখাটি লেখকের একান্তই নিজস্ব। তাই প্রকাশিত লেখার জন্য সিলেটের সংবাদ ডটকম কর্তৃপক্ষ লেখকের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

NO COMMENTS

Leave a Reply