সিলেট রেজিস্ট্রি অফিসে দুর্নীতি চরমে : ‘মানবপোকা’ কাটছে বালাম

1
384

কাইয়ুম উল্লাস: রেকর্ডরুমে ইনডেস্ক বালাম ও দলিল তল্লাশির জন্য সরকারিভাবে দুজন দক্ষ কর্মচারী নিয়োগের কথা রয়েছে। অথচ সিলেট সদর সাব রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ডরুমে অবৈধভাবে নিয়োগকৃত উমেদারদের দিয়ে চলে তল্লাশির কাজ!

প্রতিদিন রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলের নকল তুলতে লোকজন এসে বালাম বইয়ের পৃষ্ঠা না পাওয়ায় হয়রানিতে ভোগেন। রেকর্ডকিপার ভুক্তভোগীদের বলে থাকেন, ‘উঁইপোকায় বালাম বইয়ের পাতা কেটে ফেলেছে’।

বাস্তবতা হচ্ছে, অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্ত ১১ জন ‘মানুষপোকা’ বিরোধীয়ভূমির কোনো এক পক্ষের হয়ে এসব বালাম বই কেটে ফেলে। যে কারণে, দেড় দুই বছরেও জমির দলিলের নকল না পেয়ে দিশেহারা জমির প্রকৃত মালিকরা।

সিলেট সদর সাব রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ডকিপার রিনা রায় জানালেন, ইনডেক্স ছিঁড়ে যাওয়ার কারণে অনেক দলিলের বালাম নম্বর বোঝা যাচ্ছে না। তাছাড়া অনেক ইনডেক্স বা সূচিবই আগেই হারিয়ে গেছে। এ জন্য দলিল খুঁজে পেতে সমস্যা হচ্ছে।

রেকর্ডরুমের সামনে গিয়ে দেখা গেল, ভুক্তভোগীরা তাদের দলিলের নকল না পেয়ে বিরক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। অনেকে বছরের পর বছর ঘুরেও দলিলের নকল পাচ্ছেন না। এসময় অনেকেই রেকর্ডরুমের জরাজীর্ণ দশা আর অব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ করেন। রেকর্ডরুমের তাকগুলোতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ছেঁড়াফাঁড়া বালাম বইয়ের পাতা।

এলোমেলো বালাম বইয়ের স্তূপে জমেছে ধুলোর আনস্তরণ। বড় বড় কাঠের তাকের ভেতরে দুএকজন অদক্ষ উমেদার বালাম হাতড়াচ্ছেন। তাকের ওপরের ছাদের নিচে মাকড়সার জাল। মতিলাল নামের এক ভুক্তভোগী জানালেন, সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ দলিলাদি এখানে। অথচ এর কোনো যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নেই। ভেতরের বালাম ওল্টেপাল্টে পড়ে আছে।

ছাদের নিচে মাকড়সার জাল। আমার তো মনে হচ্ছে, এখানে ইুঁদর, সাপ, বাঁদুড়েরও বাসা আছে। সোয়েব আহমদ নামের অপর ব্যক্তি বললেন, কোটি কোটি টাকার জমির কাগজ এভাবে ময়লা-ধুলোয় পড়ে আছে। বালাম বইয়ের বাঁধাই ছিঁড়ে আছে। দেখার কেউ নেই। এগুলো রিভলিয়মের প্রয়োজন। সহকারী রেকর্ডকিপার প্রণয় ঘোষ জানালেন, বালামবই ফের বাঁধাইয়ের জন্য আবেদন করা হয়েছে।

কিন্তু এখনো কোনো সাড়া মেলেনি। সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল, রেকর্ডরুমের বালাম তল্লাশির জন্য দুটি পদের একটিতে জগলুল হক নামের একজনকে মাস্টাররুলে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অপর পদটি শূন্য। রেজিস্ট্রি অফিসের একটি চক্র তাদের ধান্দার স্বার্থে রেকর্ডরুমের তল্লাশির জন্য দক্ষ সরকারি কর্মচারী নিয়োগ করতে দিচ্ছে না।

উল্টো এই চক্র রেকর্ডরুমের তল্লাশিতে কর্মচারী নিয়োগের নামে ৫০ লাখ টাকার ঘুসবাণিজ্য করেছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। দুই থেকে তিন লাখ টাকা করে ঘুস নিয়ে ১১ জন উমেদার রেকর্ডরুমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর কোনো বৈধতা নেই। ঘুসের টাকা তুলতে এসব উমেদার ভূমির মালিকানা দাবিদার দুপক্ষের কোনো এক পক্ষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বালাম বইয়ের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে এবং ওভার রাইটিং ও বালাম উধাও করছে। এর ফলে সাধারণ জনগণ কাগজের অভাবে জমি হারিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন।

দখলকারীরা নির্বিঘেœ এসব জমিতে অবৈধ বসতি গেড়েছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এই উমেদারদের না সরালে রেকর্ডরুমে অদূর ভবিষ্যতে আরও অনেক বালাম বই গায়েবের ঘটনা ঘটবে। তাছাড়া একজন দক্ষ রেকর্ডকিপারও নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। নকলনবিশ অ্যাসোসিয়েশন সিলেট বিভাগীয় কমিটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক আবু ইব্রাহিম বললেন, জনস্বার্থে রেকর্ডরুমের বালাম বইয়ের রক্ষণাবেক্ষণ দরকার। ছিঁড়ে যাওয়া ভলিয়মগুলোর রিপ্রিন্ট করা খুবই জরুরি।

সিলেট সদর সাব রেজিস্ট্রার আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, এটা ঠিক, দলিলের বালামবইগুলো নাড়াচাড়ার কারণে ছিঁড়ে গেছে। কিছু সমস্যা আছে। এগুলো সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। বালামবই বাঁধাই ও রিপ্রিন্টের ব্যবস্থা করা হবে। জনসাধারণ যেভাবে হয়রানি না হয় আমরা তার ব্যবস্থা করব। উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। প্রমাণ পেলে অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সুত্র:- সবুজ সিলেট

(Visited 7 times, 3 visits today)

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here