বন্যায় নিল ধান ও মাছ : নদী নিল ঘরবাড়ি

0
256

সিলেটের সংবাদ ডটকম: বন্যায় নিল আমরার (আমাদের) ধান ও মাছ ও নদীয়ে ঘরবাড়ী, এখন আমরা কিতা (কি) করতাম (করবো)। এ কথাগুলো বলতে বলতে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন সত্তর বছরের বৃদ্ধ আনা মিয়া।

তিনি বলেন, আমাদের এখন আর কিছুই রইলোনা। ক্ষেতের ধান, মাছ, মাছের পর এখন মাথা গোজার টাই ঘরও চলে যাচ্ছে নদীগর্ভে।শেষ সম্বলটুকু নদীতে চলে গেলে আমরা কোথায় যাবো। তিনি বলেন, আমার বাড়িটি ৪র্থ বার তৈরী করেছি,পূর্বে তৈরী তিনটি বাড়িই  নদী গর্ভে চলে গেছে।

এসময় তার পাশে থাকা ছানু মিয়া (৬০) বলেন, প্রায় একযুগ আগে পানিআগা গ্রামের ৩৬ টি পরিবারের বসতবাড়ি একই রাতেই নদীতে তলিয়ে যায়। এসকল ক্ষতিগ্রস্ত লোক ক্ষতিপূরণের অনেক আশ্বাস পেলেও এখনো কোন ক্ষতিপূরণ এরা পায়নি। সরেজমিন উপজেলার শরীফগঞ্জ ইউপির পনাইচক, পানিআগা ও মেহেরপুর এলাকায় শনিবার পরিদর্শনে গেলে দেখা যায়, মানুষের এসব করুণ চিত্র।

শুধু কালা মিয়া নয় কপাল পুড়েছে এসব এলাকার অসংখ্য মানুষের। কুশিয়ারার নদী ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে তাদের অসংখ্য ঘরবাড়ি ।এদের মধ্যে কেউ কেউ এলাকা ছেড়েও চলে গেছেন।এ ইউনিয়নেরই বেশ কিছু অংশ জুড়ে রয়েছে দেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকির একাংশ। হাকালুকিতে এসব এলাকার লোকজনের ফলানো সোনালী ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন শত শত লোক।

এসকল এলাকার কৃষকের চোখে মুখে এখন শুধু সষের্র ফুল। সরেজমিন এলাকায় গিয়ে কথা হয় কৃষক, ব্যবসায়ী সহ বিাভন্ন শ্রেণীর লোকজনদের সাথে। তারা জানান, চৈত্রের অকাল বন্যায় হাকালুকি হাওরে থাকা এ এলাকার কৃষকদের প্রায় দুই হাজার একর সোনালী ধান তলিয়ে যায় অথৈ বন্যার পানিতে। সেই সাথে ভেসে যায় তাদের ঘেরের মাছ।

এর পর পানি কিছুটা কমে গেলে গোটা এলাকায় ধান পচে সৃষ্টি হয় উৎকট গন্ধ।ভেসে ওটে হাওরে থাকা মাছ। স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে ঔষধ ছিটানোর কারণে গন্ধ কিছুটা কমে গেলেও এখন নতুন করে ভাঙ্গছে তাদের বসত-ভিটে। একের পর এক ঘর-বাড়ী, খেতের ফসলী জমি ও বিভিন্ন স্থাপনা হারিয়ে তারা এখন দিশেহারা।

বর্তমানে ভাঙ্গনের হুমকির মধ্যে রয়েছে অসংখ্যক ঘর-বাড়ী ও বিভিন্ন প্রতিষ্টান। এছাড়াও শরিফগঞ্জ ইউপির ৬ নং ওয়ার্ডের বেশ কয়েকজন লোক অভিযোগ করে বলেন, আমাদের এ দুর্যোগের খবর ইউনিয়ন চেয়ারম্যানও ঠিকমতো নিচ্ছেন না। আর ৬নং ওয়ার্ডের মেম্বার বিজয়ী মেম্বার নির্বাচনের পরপরই চলে গেছেন সৌদি আরবে।

তারা এখন অভিবাবকহীন। কার কাছে গিয়ে এস দুঃখের কথা বলবে তারা।  এ প্রসঙ্গেঁ পানিয়াগা গ্রামের মাজন মিয়া (৩০) জানান, রাক্ষুসী কুশিয়ারা শরীফগঞ্জ বাজার খেয়ে ফেলেছে।নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে বাজারের কয়েকশ দোকানপাট।তিনি আরো জানান,মেহেরপুর (কালারবাজার) বাজারের বেশ কয়েকটি দোকানপাট কুশিয়ারা নদী ভাঙ্গনে তলিয়ে গেছে।

কাদিপুর  বাজারটাও অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। মেহেরপুর এলাকার নুরুল আমিন (৩৫) বলেন, মেহেরপুর,খাটখাই,পানিয়াগা সহ বেশ কয়েকটি গ্রামের সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম কুশিয়ারা ডাইক রাস্তার পনাই চক উচ্চ বিদ্যালয়ের সামন পুরোপুরি নদীগর্ভে চলে গেছে। এতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে বেশ কয়েকটি গ্রামের ।বেপাকে পড়েছে এ স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা।

তাদের এখন নৌকা যোগে আসতে হচ্ছে স্কুলে। স্কুলটিও রয়েছে হুমকির মুখে।যদি কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিক নদীতে ব্লক স্থাপন না করেন তাহলে এ ইউনিয়নের নদী পাড়ের সকল স্থাপনা একদিন নদীগর্ভে হারিয়ে যাবে। পনাইচক গ্রামের আব্দুল কাদির বলেন,গেল কয়েকদিনের বৃষ্টিতে নদীভাঙ্গন প্রকট আকার ধারণ করেছে। নদীপারের মানুষ রয়েছেন ভাঙ্গন আতংকে।

এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কুশিয়ারা নদীর ভাঙ্গনে চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে পনাইচক উচ্চ বিদ্যালয়, স্থানীয় একটি মাজার, অসংখ্যক ঘর-বাড়ী ও স্থাপনা। এলাকার অনেকেই জানান, একটু বেশী বৃষ্টি হলেই ঔই স্থাপনাগুলো যেকোন সময় তলিয়ে যেতে পারে নদীতে। একের পর এক ভাঙ্গনের ফলে লোকজন দিগভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন।

বন্যার পানি না কমার কারণে আমন, ২৮ ও ২৯ জাতের ধান রোপন করারও আশা নেই। তাদের প্রশ্ন আমরা এখন কি করবো। কোথায় যাব। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন জানান, ‘ভাঙনের ব্যাপারে তিনি অবহিত আছেন। চেয়ারম্যানের চিঠি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জরুরি ট্যাগ দিয়ে তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ডে তা পাঠিয়েছেন, কিন্তু কোন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়ে সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে কয়েক দফা যোগাযোগ করেও তাদের অফিসিয়াল নাম্বারে সংযোগ পাওয়া যায়নি।

(Visited 15 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here