তোষামোদ

0
219

আতাউর রহমান: তোষামোদ তথা চাটুকারিতা পছন্দ করেন না এমন লোকের সংখ্যা সংসারে বিরল। কেননা মানব-প্রকৃতিই এমন যে আমরা একজন চাটুকারের কথায় যতই অবজ্ঞার হাসি হাসি না কেন, অন্তরের অন্তঃস্তলে এই ভেবে খুশি হই যে লোকটির কথায় নিশ্চয়ই কিছুটা সত্য অন্তর্নিহিত আছে।

এ কারণে বলা হয়ে থাকে যে, কাউকে তোষামোদ করার আর কোনো উপায় খুঁজে না পেলে শুধু এটুকু বলাই যথেষ্ট হবে, ‘আপনার মতো লোককে তোষামোদ করা যায় না। নিজকে অনুগ্রহভাজন করানোর উদ্দেশ্যে কাউকে অপরিমিত প্রশংসা করার নামই হচ্ছে তোষামোদ।

আর ইংরেজি ভাষায় তোষামোদ সম্পর্কে দুটো প্রসিদ্ধ আপ্তবাক্য আছে : (এক) ‘ফ্লেটারি করাপ্ট্স বোথ দ্য রিসিভার অ্যান্ড দ্য গিভার,’ অর্থাত্ ‘তোষামোদ দাতা ও গ্রহীতা উভয়কে কলুষিত করে। (দুই) ‘ইমিটেশন ইজ্ দ্য সিনসিয়ারেস্ট ফর্ম অর ফ্লেটারি,’ অর্থাত্ ‘অনুকরণ করা হচ্ছে সবচাইতে নির্ভেজাল তোষামোদ।

শেষোক্ত কথাটির অর্থ হচ্ছে এই যে, কাউকে অনুসরণ ও অনুকরণ করার মানে হচ্ছে তাকে সুপেরিয়র অর্থাত্ শ্রেষ্ঠতর জ্ঞান করা, যেটা তোষামোদের পর্যায়েই পড়ে। সে যা হোক। তোষামোদের অপর নাম হচ্ছে চাটুকারিতা এবং সমালোচকের দৃষ্টিকোণ থেকে চাটুকারিতাকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞারিত করা যায়। এই যেমন চাটুকারিতা হচ্ছে বেঠিক কারণে সঠিক কথাটা বলার কলাকৌশল কিংবা অন্যেরা নিজেদের সম্পর্কে যা ভাবেন  সম্পূর্ণ সেরূপ তাদেরকে বলা।

চাটুকারিতা চুইংগামের মতো এটাকে উপভোগ করা যায়, কিন্তু গিলতে নেই। চাটুকারিতা সুগন্ধির মতো এটার সুঘ্রাণ নেওয়া চলে, কিন্তু গলাধঃকরণ করতে নেই। চাটুকারিতা একজনকে ভাবতে শেখায় তিনি যা আছেন তার চাইতে তিনি শতগুণে শ্রেয়। সর্বোপরি, চাটুকারিতাকে আজকাল বলা হয় ‘আর্টিফিশিয়েল সুইটেনার’ অর্থাত্ কৃত্রিম মিষ্টি-প্রদায়ক। ইত্যাদি ইত্যাদি। আর বিশ্বের তাবত্ জ্ঞানী-গুণীও তোষামোদ তথা চাটুকারিতা সম্পর্কে অনেক সরস মন্তব্য করে গেছেন।

উদাহরণস্বরূপ যেমন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী আইরিশ নাট্যকার জর্জ বার্নার্ডশ (১৮৫৬-১৯৫০) বলেছেন, ‘মানুষকে যা সন্তুষ্ট করে তা হচ্ছে, আপনি তাকে তোষামোদের যোগ্য ভাবছেন। আমেরিকান কূটনীতিবিদ ও রাজনীতিজ্ঞ আদর্শই স্টিভেন সন (১৯০০-৬৫) বলেছেন, আমি মনে করি, তোষামোদ কাউকে আঘাত করে না অর্থাত্ আপনি যদি ওটা নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহণ না করেন।

আর হাস্য-সম্রাট মার্ক টোয়েন (১৮৩৫-১৯১০) তার স্বভাবসিদ্ধ প্রথায় বলেছেন, ‘আমি আমার সম্পর্কে একটি প্রশংসাসূচক কথা উদরস্থ করে দু মাস বেঁচে থাকতে পারব। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তোষামোদ তথা চাটুকারিতা পছন্দ করেন না এমন লোকের সংখ্যা সংসারে বিরল। কেননা মানব-প্রকৃতিই এমন যে আমরা একজন চাটুকারের কথায় যতই অবজ্ঞার হাসি হাসি না কেন, অন্তরের অন্তঃস্তলে এই ভেবে খুশি হই যে লোকটির কথায় নিশ্চয়ই কিছুটা সত্য অন্তর্নিহিত আছে।

এ কারণে বলা হয়ে থাকে যে, কাউকে তোষামোদ করার আর কোনো উপায় খুঁজে না পেলে শুধু এটুকু বলাই যথেষ্ট হবে, ‘আপনার মতো লোককে তোষামোদ করা যায় না। ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ান নাকি একবার তার এক সহকারীকে বলেছিলেন, ‘আমাকে কেউ তোষামোদ করতে পারবে না। প্রত্যুত্তরে সহকারী বললেন, ‘আমি আগামীকাল এসে এটার জবাব দেব।

পরদিন সহকারীটি এসে বললেন, ‘স্যার আমি কাল সারা রাত চিন্তা করে দেখলাম, আপনার মতো লোককে সত্যিই কেউ তোষামোদ করতে পারবে না। নেপোলিয়ান তখন হেসে ফেলে বললেন, ‘নাও আই অ্যাম ফ্লেটারড, আমাকে এখন তোষামোদ করা হলো। আর মহিলাদের বেলায় তো কথাই নেই, মহিলাদেরকে ঘায়েল করার মোক্ষম অস্ত্রই হচ্ছে তোষামোদ। বিখ্যাত ব্রিটিশ রম্যলেখক জেরামকে জেরম যথার্থই বলেছেন মহিলারা বলে থাকেন যে তারা চাটুকারিতা ঘৃণা করেন।

কিন্তু যখন আপনি বলবেন ‘ডার্লিং, তোমার বেলায় এটা চাটুকারিতা নয়, নির্জলা সত্য’, তখন তিনি যে হাসিটা হাসবেন সেটা হচ্ছে অনুমোদনের হাসি। আমাদের ধর্মমতেও তাই স্ত্রীকে খুশি করার জন্য স্বামীর পক্ষে একটু-আধটু তোষামোদ কিংবা নির্দোষ মিথ্যা বলায় কোনো অপরাধ নেই। যেমন জনৈক স্বামী তার স্ত্রীর জন্মদিন ভুলে যাওয়াতে স্ত্রী কর্তৃক তিরস্কৃত হয়ে বলেছিলেন, ‘কী করে স্মরণ করব, বলো? গত এক বছরে তো তুমি মোটেই বুড়িয়ে যাওনি, বরং আগের চাইতে তরুণী হয়েছ। তোষামোদের সমার্থক আরেকটি বাংলা শব্দ হচ্ছে ‘চামচাগিরি’।

চামটা অর্থাত্ চামচ শব্দ থেকেই ‘চামচাগিরি’ শব্দের উত্পত্তি। তাই তো পাকিস্তান আমলে তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তানের রাজধানী লাহোরে সরকারের কিছু সমর্থক যখন সরকারের খয়েরখাঁগিরি করতে গিয়ে একটি জনবসতিপূর্ণ রাস্তা দিয়ে মিছিল সহকারে যাচ্ছিলেন, তখন গৃহিণীরা বড় বড় চামচ হাতে পাকঘর থেকে বেরিয়ে এসে চামচগুলোকে উঁচিয়ে ধরে তাদেরকে বেশ বিদ্রূপ করছিলেন। পত্রিকার পাতায় ছবিসহ খবরটি পাঠ করে পাঠকেরা তখন সেটা খুব উপভোগ করেন।

তা সত্যি বলতে কি, তোষামোদ তথা চামচাগিরির সবচাইতে উর্বর ক্ষেত্র হচ্ছে রাজনীতি ও কূটনীতির পীঠস্থানসমূহ, কেননা এ দুটি ক্ষেত্রেই পণ বা পুরস্কার হচ্ছে তুলনামূলকভাবে অধিকতর আকর্ষণীয়। বিশ্বসাহিত্যেও তোষামোদের ভূরি ভূরি নিদর্শন পাওয়া যায়। আমাদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তার ‘দুই বিঘে জমি’ শীর্ষক কবিতার এক জায়গায় লিখেছেন, ‘বাবু যত বলে পারিষদদলে বলে তার শতগুণ।

পারিষদের শতগুণ বলার ব্যাপারটা তোষামোদ বৈ আর কিছুই নয়। আর ইংরেজি সাহিত্যে শেক্সপীয়রের ‘কিং লিয়ার’ শীর্ষক নাটকে  আছে : রাজা তার তিন মেয়েকে তার রাজ্য সমানভাবে ভাগ করে দিতে চান। তবে তত্পূর্বে তিনি মেয়েদের কাছে জানতে চাইলেন ওরা কে তাকে কতখানি ভালোবাসে।

তদুত্তরে বড় দুই মেয়ে তোষামোদ করে বলল যে ওরা তাকে কতটা ভালোবাসে সেটা ভাষায় রপ্ত করা সম্ভব নয়, কোনো কিছু দিয়েই সে ভালোবাসার পরিমাপ করা যাবে না, কিন্তু কনিষ্ঠ মেয়েটি বলল যে সে তাকে পিতা হিসেবে যতটুকু ভালোবাসার ঠিক ততটুকুই ভালোবাসে এর চাইতে বেশিও নয়, কমও নয়। রাজা বড় দুই মেয়ের তোষামোদে প্রতারিত হয়ে ওদেরকে ওদের ভাগ বুঝিয়ে দিলেন ও কনিষ্ঠ কন্যাকে ওর ভাগ থেকে বঞ্চিত করলেন।

অতঃপর রাজার জীবনে হঠাত্ অপ্রত্যাশিত দুর্যোগ নেমে এলে পর তিনি আশ্রয় প্রার্থনা করলে বড় দুই মেয়ে তাকে দূর-দূর করে তাড়িয়ে দিল, কিন্তু ছোট মেয়েটি তাকে আদর-যত্ন করে বাঁচিয়ে রেখেছিল। অতএব মিথ্যে তোষামোদে কখনো প্রতারিত হতে নেই। আর হ্যাঁ, ঐতিহাসিকভাবে নৃপতি ও সম্রাটদেরকে সম্বোধনের বেলায় তোষামোদই ছিল স্বাভাবিক অভিব্যক্তি।

এ ক্ষেত্রে মোগল সম্রাটদেরকে সম্বোধনের নমুনা স্মরণ করা যেতে পারে। আর অতীতে কবি-সাহিত্যিকদের পক্ষেও শাসনরত নৃপতিকে তোষামোদ করাটাই ছিল রেওয়াজ, যেমনটি করেছেন ইংরেজ কবি স্পেনসার তার ‘দ্য ফেয়ারি কুইন’ কাব্যে রানী প্রথম এলিজাবেথকে।

আরবি সাহিত্যেও এ সম্পর্কিত একটি মজার উপাখ্যান আছে :- আরবের এক কবি তার প্রাদেশিক শাসনকর্তার প্রশস্তিমূলক একটি কবিতা রচনা করে শাসনকর্তার সামনে সেটা আবৃত্তি করলে শাসনকর্তা প্রীত হয়ে তাকে আর্থিক পুরস্কার প্রদান করতে চাইলেন এবং কবির প্রত্যাশা কী পরিমাণ সেটা জানতে চাইলে কবি বললেন, ‘হুজুর আমাকে এক লক্ষ দিরহাম দিন। পরিমাণটা কি খুব বেশি হয়ে যাচ্ছে না? ন্যূনপক্ষে কত চান, বলুন? শাসনকর্তা প্রশ্ন করলেন।

এবারে কবি মাত্র এক হাজার দিরহাম চাইলে শাসনকর্তা বলে উঠলেন, এই দুই চাওয়ার মধ্যে পার্থক্যটা এত বিশাল কেন? এবারে কবি বিনয় বিগলিত কণ্ঠে জানালেন, হুজুর, প্রথমোক্ত পরিমাণটা ছিল আপনার অবস্থান ও পদমর্যাদার বিবেচনায়, আর দ্বিতীয়োক্ত পরিমাণটা হলো আমার অবস্থান ও পদমর্যাদা বিবেচনায়। ‘আল্লাহর কসম, আমরা আমাদেরকে অবমূল্যায়ন করব না।

এই বলে উক্ত শাসনকর্তা কবিকে এক লক্ষ দিনার প্রদান করার নির্দেশ দিলেন। পরিশেষে আরেকটি প্রাসঙ্গিক ঐতিহাসিক উপাখ্যান: খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে গ্রিক দার্শনিক জয়োজেনসই, যিনি গুহামুখে উপবেশনরত অবস্থায় ছিলেন। তখন দিগ্বজয়ী বীর আলেকজান্ডার এসে ‘আপনার জন্য আমি কী করতে পারি’ জিজ্ঞেস করায় দার্শনিক বলেছিলেন, কিছুই করার প্রয়োজন নেই।

আমি রোদ পোহাচ্ছিলাম, আপনি সূর্যকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছেন, একটু সরে গেলেই হয়। অত্যাচারী রাজা ডেনিসের তোষামোদ না করে খুব সাদাসিধে জীবন-যাপন করতেন এই দার্শনিক। অপরপক্ষে তার সমসাময়িক আরেক দার্শনিক এরিস্টিপাস রাজাকে তোষামোদ করে জাঁকজমকপূর্ণ জীবন যাপন করছিলেন।

একদিন এরিস্টিপাস ডায়োজেনিসকে শুধু শাক দিয়ে রুটি খেতে দেখে বললেন, ‘রাজাকে তোষামোদ করে চললে আপনাকে শুধু শাক দিয়ে রুটি খেতে হতো না। আর আপনি যদি শুধু শাক দিয়ে রুটি খাওয়া শিখতেন, ডায়োজেনিস প্রত্যুত্তর করলেন, ‘তাহলে রাজাকে আপনার তোষামোদ করে চলতে হতো না। লেখক:- বাংলাদেশ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক

(Visited 11 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here