রোজাদারের কোরআন পাঠ ও দোয়া অব্যর্থ

0
248

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান: আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, সালাত কায়েম করে, আমার দেয়া রিজিক থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারাই আশা করতে পারে এমন ব্যবসার, যা কখনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

কারণ আল্লাহ তাদের কর্মের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরও অধিক দান করবেন। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু। (সূরা ফাতির : ২৯-৩০)। আল্লাহর কিতাব অধ্যয়ন দুই প্রকার। প্রথমত, শাব্দিক তিলাওয়াত আল কোরআন পাঠ করা।

এর ফজিলতের ব্যাপারে কোরআন ও সুন্নাহে অনেক দলিল-প্রমাণ রয়েছে। যেমন বোখারি ও মুসলিমে কোরআন পাঠ অন্যতম রয়েছে, নবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যিনি কোরআন মজিদ শিক্ষা করেন এবং অন্যকে শিক্ষা দেন। অনুরূপভাবে বোখারি ও মুসলিমে রয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল কোরআনে দক্ষ ও পন্ডিত ব্যক্তিরা সম্মানিত পুণ্যবান ফেরেশতাদের সঙ্গে থাকবেন।

যে ব্যক্তি কোরআন আটকে আটকে তিলাওয়াত করে এবং তা তার জন্য কষ্টকর হয়, তার জন্য দুইটি প্রতিদান রয়েছে।’ সহিহ মুসলিমে আরও বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কোরআন তিলাওয়াত কর। কেননা কোরআন কিয়ামতের দিন তিলাওয়াতকারীর জন্য সুপারিশ করবে।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোরআনের একটি হরফ (অক্ষর) পাঠ করবে, তাকে একটি নেকি প্রদান করা হবে।

আর প্রতিটি নেকি ১০ গুণ বৃদ্ধি করা হবে। আমি বলি না যে, আলিফ-লাম-মিম একটি হরফ। বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ, মিম একটি হরফ।’ (তিরমিজি: ২৯১০)। দ্বিতীয়ত, হুকমি তিলাওয়াত বা প্রায়োগিক পঠনÑ অর্থাৎ আল্লাহর কথাকে বিশ্বাস করা, তাঁর নির্দেশ মেনে নিয়ে তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে বর্জন করে কিতাব তথা আল কোরআনের সব হুকুম-আহকাম বাস্তবায়ন করা।

অর্থাৎ কোরআনের বিধানকে তেলাওয়াত করা। আর তার অর্থ হচ্ছে, কোরআন প্রদত্ত যাবতীয় সংবাদকে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করা, সব আদিষ্ট বিষয় পালন ও নিষিদ্ধ বিষয় পরিত্যাগ করার মাধ্যমে তার বিধানাবলি মেনে নেয়া। বস্তুত এ প্রকারই হচ্ছে কোরআন নাজিলের বৃহত্তম লক্ষ্য। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমরা আপনার প্রতি নাজিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানরা উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সূরা সোয়াদ : ২৯)।

এজন্য সালাফে সালেহিন (রহ.) কোরআন তিলাওয়াতের এ পদ্ধতির ওপর চলে কোরআন শিক্ষা করেছেন। এর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছেন এবং মজবুত আকিদা-বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে এর যাবতীয় বিধানকে ইতিবাচক ধারায় বাস্তবায়িত করেছেন। আবু আবদুর রহমান আসসুলামি (রহ.) বলেন, ‘উসমান ইবন আফ্ফান, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ প্রমুখ যারা আমাদের কোরআন শিক্ষা দিতেন তারা বলেছেন, তারা যখন রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে ১০টি আয়াত শিখতেন।

যতক্ষণ পর্যন্ত তা ভালোভাবে না শিখতেন ও তাতে যেসব জ্ঞান ও আমল করার কথা রয়েছে তা বাস্তবায়ন না করতেন, ততক্ষণ পর্যন্ত সামনে অগ্রসর হতেন না। তারা বলেন, আমরা এভাবেই কোরআন, জ্ঞান ও আমল সবই শিখেছি। (তাফসিরে তাবারি)। আর এটাই হলো কোরআন তিলাওয়াতের ওই প্রকার, যার ওপর সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য নির্ভর করে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অতঃপর যখন তোমাদের কাছে আমার পক্ষ থেকে হিদায়াত আসবে, তখন যে আমার হিদায়াতের অনুসরণ করবে, সে বিপথগামী হবে না এবং দুর্ভাগাও হবে না। আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জন্য হবে নিশ্চয় এক সংকুচিত জীবন এবং আমি তাকে কিয়ামত দিবসে উঠাব অন্ধ অবস্থায়। সে বলবে, ‘হে আমার রব, কেন আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন?

অথচ আমি তো ছিলাম দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন? তিনি বলবেন, ‘এভাবেই তোমার কাছে আমার নিদর্শন এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাবেই আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হলো। আর এভাবেই আমি প্রতিফল দান করি তাকে, যে বাড়াবাড়ি করে এবং তার রবের নিদর্শনে ঈমান আনে না। আর আখিরাতের আজাব তো অবশ্যই কঠোরতর ও অধিকতর স্থায়ী।’ (সূরা ত্বহা: ১২৩-১২৭)।

রমজানের অফুরন্ত কল্যাণের অন্যতম দিক হলো এ মাসে রোজাদারের দোয়া কবুল করা হয়। রমজান শুধু ইবাদতের বিশেষ মৌসুম নয়, দোয়ারও অতুলনীয় রোজাদারের দোয়া উপলক্ষ। পবিত্র কোরআনে সূরা বাকারায় পর পর কয়েকটি আয়াতে রমজান ও রোজা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়েছে। এর অব্যবহিত পরই আল্লাহ তার নবীকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে, (তাদের বলো) আমি রয়েছি সন্নিকটে।

যারা প্রার্থনা করে, আমি তাদের প্রার্থনা কবুল করি, যখন তারা আমার কাছে প্রার্থনা করে।’ (সূরা বাকারা: ১৮৬)। কোরআনের ব্যাখ্যাবিশারদদের মতে, রোজার আলোচনার ধারাবাহিকতায় দোয়ার প্রসঙ্গ উত্থাপনের মাধ্যমে রোজাদারের দোয়া বিশেষ কবুলযোগ্য বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে। তাই রোজাদারের করণীয় আমলগুলোর মধ্যে দোয়াও অতিগুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (সা.) এক হাদিসে স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া ফেরত দেয়া হয় না : রোজাদারের দোয়া, যে যাবৎ সে ইফতার করে; ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া এবং মজলুম ব্যক্তির দোয়া।’ (তিরমিজি)।

আমরা হাদিসে কুদসি থেকে জেনেছি, রোজা কেবল আল্লাহর জন্য, তাই রোজার পুরস্কার আল্লাহ নিজেই দেবেন। রোজাদারের জন্য কিয়ামতে ও জান্নাতে অকল্পনীয় পুরস্কার ছাড়াও দুনিয়ায় উত্তম পুরস্কার হলো তার দোয়া বিশেষভাবে কবুল করা হয়। বিশেষ করে রমজানের প্রত্যেক রাতে এবং ইফতারের পূর্বমুহূর্তে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘ইফতারের সময় আল্লাহ বহু লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। আর রমজানের প্রতি রাতেও। সিয়াম পালনকারী প্রত্যেক বান্দার দোয়া কবুল হয়।’ (মুসনাদ আহমদ)।

আরেক হাদিসে তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই ইফতারের সময় সিয়াম পালনকারীর দোয়া কবুল হয়। (বায়হাকি)। রহমতের এ ভর মৌসুমে তাই বেশি বেশি দোয়া করা উচিতÑ বিশেষ করে শেষ রাতে, সাহরির শেষ সময়, ইফতারের পূর্বমুহূর্তে, রুকু-সেজদায়, ফরজ নামাজের পর, কোরআন তেলাওয়াতের পর, তারাবির নামাজে চার রাকাতের বিরতিতে দোয়ায় মনোনিবেশ করা উচিত।

দোয়া করতে হবে কাতরভাবে ও দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে। আল্লাহর কাছে বেশি বেশি চাইতে হবে। একমাত্র আল্লাহই এমন দয়ালু সত্তা, যিনি না চাইলে বরং রাগ করেন। হাদিসের ভাষ্যমতে, তিনি প্রতি রাতে বান্দাকে দেয়ার জন্য ডাকতে থাকেন।

কোরআনে তিনি বারবার তার কাছে চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বান্দাকে দ্বিধাহীনভাবে প্রার্থনার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, ‘হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সব গোনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা জুমার : ৫৪)। লেখক:- মোহাম্মদ মনজুর হোসেন খান, পাঠানপাড়া খানবাড়ি, সিলেট।

(Visited 7 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here