জাল আছে মাছ নেই : ভালো নেই হাওরপারের মৎস্যজীবি সম্প্রদায়

0
300

অনিমেষ দাস, জামালগঞ্জ, (সুনামগঞ্জ): সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার হাওরপারের মৎস্যজীবি সম্প্রদায় ভালো নেই। জাল আছে মাছ নেই, চাল নেই, নেই নুন মরিচ ও তেল। অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটছে হাওরপারের জেলে পরিবারের।

আয়-রোজগার না থাকায় অভাব-অনটনেরও শেষ নেই, চলছে চরম দুর্দিন। এ বছর ধান নেই, মাছও কম। সবই হারিয়ে নি:স্ব হাওরতীরের কৃষি ও মৎস্যজীবি মানুষ। এখন মাছের ভর মৌসুম কিন্তু জেলেরা হাওরে জাল ফেলে হতাশই হচ্ছেন।

মিলছে না আশানুরূপ মাছ, তাছাড়া ভাসমান পানিতে মাছ ধরা নিয়েও রয়েছে নানা বাঁধা-বিপত্তি। যে এলাকাতে জালে কম-বেশি মাছ ধরা পড়ছে সেখানে মাছ ধরতে দিচ্ছেন না বিল ইজারাদার। বিলের আশপাশ ভিড়লেই নানা বিড়ম্বনা। দুর্ভোগ গ্রস্থরা জানালেন, এ বছর হঠাৎ উত্তাল হাওর রাক্ষুসে হয়ে সবই গ্রাস করেছে হাওর।

তাই বোরো চাষীদের মতো দুর্দিনে হাওরতীরের মৎস্যজীবিরাও। এ সংকট কাটাতে নেই তাদের সহায়-সম্বল। প্রতিদিনই নানা আশার বাণী আর প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়িই যেনো তাদের শান্তনা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও মিলে না সে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। তাই তাদের এখনকার বাস্তবিক দৃশ্য অনেকটাই এখন করুণ। আশানুরূপ কোনো সহায়তা এখনও জুটেনি তাদের।

দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের নিশ্চয়তাও নেই। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে তাদের। বেঁচে থাকার সংগ্রামে প্রতিদিনই আগের মতো ছুটে চললেও তা হচ্ছে অসার। কেননা, এ বছর হাওর হারিয়েছে তার জৌলুস। আয়-রোজগার নেই। তাই পরিবারের খাওয়া-বাঁচা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা-এমন দুশ্চিন্তায় এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন।

স্থানীয় মৎস্যজীবিরা জানান, মড়কের পর জালে মাছ ধরা পড়ছে কম। অনান্য বছর এ সময় নানা জাতের দেশীয় প্রজাতির মাছ জালে ধরা পড়লেও এ বছর ভিন্নচিত্র। সারা দিন জাল ফেলেও মিলছে না পর্যাপ্ত মাছ। তারপরও পরিবারের জীবিকার প্রয়োজন, অলস সময় আর নেশার টানে ভাসমান নতুন পানিতে জাল ফেলছেন মৎস্যজীবিরা। অনেকটা হতাশ হয়ে ফিরছেন বাড়িতে।

যে হাওরকে উপলক্ষ করে চলে তাদের জীবন-জীবিকা। সে হাওর এখন জীবিত থেকেও মৃত। তাই হাওরতীরের মানুষগুলো এখন চরম অসহায়। এ বছর চৈত্রের অকাল বন্যায় তাদের স্বপ্নের মৃত্যু ঘটেছে। টানা ভারী বর্ষণ আর উজানের পাহাড়ি ঢল কেড়ে নিয়েছে তাদের সোনালী ফসল। বোরো ধানের পর মরছে মাছ, গবাদি পশু আর জলজ প্রাণি ও উদ্ভিদ।

উত্তাল হাওর একে একে গিলে খেয়েছে সব সম্পদ। বসতভিটা ছাড়া এখন হাতে আর অবশিষ্ট নেই বেঁচে থাকার অবলম্বনের মতো কোনো সম্পদ। এমন দুঃসময়ে বেকারত্ব গোছাতে মিলছে না অন্য পেশাও। তাই ঘুরেফিরে মাছ ধরা আর বিক্রি করাই তাদের একমাত্র নির্ভরযোগ্য পেশা। সরেজমিনে হাওরপারের জেলে এলাকায় গেলে কথা হয় স্থানীয় মৎস্যজীবীদের সাথে, তারা কান্নাজড়িত কণ্ঠে তুলে ধরেন তাদের অসহায়ত্বের কথা।

তারা জানান, জন্মের পর এতো বড়ো দুর্যোগ আর দেখেননি তারা। অনান্য বছর বন্যা হলেও কিছু ধানও ঘরে তুলতে পেরেছেন। বানের পানিতে ধান গেলেও প্রচুর মাছ পেয়েছেন। কিন্তু এ বছর ভিন্ন। বোরো ধানের সাথে মরেছে মাছও। জেলেপল্লীর বাসিন্দারা ক্ষোভের সাথে জানালেন এখন পর্যন্ত তারা সরকারি তরফে কোনো সহায়তা পাননি।

তারা বলেন, আমাদের এমন চরম দুর্দিনে আশা ছিলো সরকার আমাদের পাশে দাঁড়াবেন। সংকটময় এ দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবেন। সরকারের তরফে এমন প্রতিশ্রুতি ফুলঝুড়ি শোনালেও এখন ক্ষতিগ্রস্থ মৎস্যজীবি হিসেবে আমরা কিছুই পাইনি। অকাল বন্যার পর হাওরপারের মানুষের জন্য ওএমএস বা ভিজিএফ’র যে ত্রাণ সহায়তা এসেছিলো তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল থাকায় ওই সহায়তাও আমাদের কপালে জুটেনি।

এখন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে গেলে তারা বলেন, মৎস্যজীবিদের জন্য এখনও বরাদ্দ আসেনি আসলে পাবেন। তারা ক্ষোভের সাথে জানালেন, আমাদের এমন দুর্যোগ চলে গেলেও মনে হয় সরকারের ওই ত্রাণ সহায়তা আমাদের কাছে পোঁছাবে না। মাছ ধরছিলেন সেলিম মিয়া, হযরত আলী, আলতাফ মিয়া। কেমন মাছ ধরা পড়ছে জানতে চাইলে তারা বলেন, ভাই আগের মাছ নাই।

এ বছর মড়কের পর মাছ ধরা পড়ছে খুবই কম। সারা দিন মাছ ধরে ১০০ টাকারও মাছ পাই না। এ দিয়ে নিজে খাবো কি আর পরিবারের সদস্যরা খাবে কি। তারা জানালেন, মাছ যে একেবারেই নেই এমন নয়। এ বছর ধান পচে প্রচুর খাবার থাকায় ওই মাছগুলো হাওরের বিল এলাকায় চলে যাওয়াতে হাওরের তীরবর্তী ভাসমান পানিতে জালে মাছ ধরা পড়ছে কম।

আর বিল এলাকায় মাছ ধরা পড়লেও ইজারাদারদের কারণে মাছ ধরা তো দূরের কথা নৌকা নিয়ে বিলের পাশ দিয়েও যাতায়াত করা কষ্টকর। জমি বর্গা নিয়ে তারা চাষ করেছিলেন বোরো ধান। কিন্তু অকাল বন্যায় একটি ধানও ঘরে তুলতে পারেননি। এখন জালে মাছও ধরা পড়ছে কম। অনান্য বছর ধান না থাকলেও মাছ ছিলো কিন্তু এ বছর কিছুই নেই।

তাই পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা দিশেহারা। মড়কের পর পুঁটি, টেংরা, মলা, ঢেলা আর ছোটো চাঁদাজাতীয় মাছ ছাড়া জেলেদের জালে ধরা পড়ছে না বড়ো মাছ। তাই স্থানীয় মাছের বাজারগুলোরও ক্রয়-বিক্রয় কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়েছে। স্থানীয় মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, এ বছর হাওরে অনেক মাছ মারা গেছে। হাওরতীরবর্তী এলাকায় নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন অনেক। চলতি মাসের মধ্যেই পোনা মাছ হাওরে অবমুক্ত করা হবে।

(Visited 17 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here