রহস্যময় রজনী

0
272

শাহিদ হাতিমী: মেঘলা রজনী। গভীর রাত। কিলখোলা দোর। বাহিরে টুপটাপ ছন্দ। হৃদয়ানুভূতি বলছে আকাশ কাঁদছে! ঈদ সালাম জানাতে এখনো দু’দিন বাকি। রবি শশীর চক্রধরায় বিশ্ব মুসলিমের শ্রেষ্ঠ উৎসব ঈদ দোরগোড়ায় হাযির।

ঈদ ফিরে আসে, ঘোরে বেড়ায়। ঈদ আনন্দ দেয়। ঈদ আমেজীয় করে তুলে উম্মাহকে। শিশু-কিশোরদের নতুন জামাপরার কী হাসি ও খুশিময় করে তোলে ঈদ। তরুণ যুবকদের ভ্রমণ প্লানসহ ঈদকে ঘিরে কতই না আয়োজন হয়।

রহমতের দশক ইতি। মাগফিরাতের দশকও শেষ। নাজাতের দশক যায় যায়। সময়টা বাঙলা প্রকৃতিতে বর্ষার। প্রচন্ড গরমে রবের গগন থেকে রহমতের শীতল বৃষ্টি ঝরছে। মুমিন উম্মাহ সাহরীর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতোমধ্যে সবক’টি মুসলিম প্রাণ দীর্ঘ সালাত আদায় করে গা’টাকে একটু এলোদুলো করাচ্ছে।

রাত পোহালে মানে আগামীকাল ঈদের জামা কিনতে যাবে ছামী ও ছাদী। একটু আগে তাদের আব্বু এ সংবাদ জানিয়েছেন। ছামীদের আব্বু আরো জানিয়েছেন তিনি সময় দিতে পারবেন না, তাদেরকে শপিংয়ে নিয়ে যাবে “ছামীদের চাচ্চু’’। সেই আনন্দে ছাদীদের ঘুম নেই। তারা তাদের চাচ্চুর রুমে ছুটে গেল, কখন তিনি নিয়ে যাবেন! চাচার ঘরের রুমে পৌঁছে ছামী ও ছাদি শোনতে পায় তাদের বোন নিরা ও নিপাকে চাচ্চু গল্প শোনাচ্ছেন।

আর যায় কোথায়? কিশোর ছামী ও ছাদি গল্পের আড্ডায় বসে পড়লো। চাচ্চুর গল্পের কাহিনিটা নাকি গেল বছর ঈদের রাতে ঘটেছিল। ছামীদের চাচ্চু একজন মাদরাসা শিক্ষক। নাম জুনায়েদ হাসান শফী। ছামীদেরক বসতে বলে একটু নিরবতা পালন করছিলেন। তখন নিরা বলে ওঠলো আব্বু থামলে কেন? বলো! নিপাও তাগদা দিল।

সে বছর রামযানের শেষদিকে শফী অসুস্থ ছিল এই বলে শফী শুরু করলো। ঘটনার সুচনা তারাবীহ নামাজের পর। রাজধানীর একটি মাসজিদ থেকে এক বিশেষ আ’মলের পর- মুনাজাত পর্ব সেরে দাওয়াইখানার পথ ধরলো শফী। ঢাকা শহরের পান্থপথে রয়েছে বেশ ক’টি নামকরা হাসপাতাল। সেখানের কতিপয় ফার্মেসির গায়ে লেখা রয়েছে ২৪ ঘন্টা খোলা।

ঔষধ না পাবার জুঁ নেই। শফী সেখানে পৌঁছে দাওয়াই কিনে বাসার দিকে রওয়া হলো। শফীদের বাসা বড়কাটরা। পুরাণ ঢাকার দিকে আগাচ্ছিলো শফী। রিক্সা ড্রাইভার পড়ন্ত বয়সী হওয়াতে ধীর গতীতেই চলছিলো বাহন। হঠাৎই একটি মোটরবাইক এক মহিলা আরোহীসহ শফীদের সামনে দাড়ালো! কিছু বুঝবার আগেই খুব দ্রুত বোরকাপরা মহিলাকে শফীর রিক্সায় ওঠিয়ে হুড তুলে শফী এবং ড্রাইভারকে দ্রুত কেটে পড়তে বললো মটর সাইকেলওয়ালা পুরুষ লোকটি! শফী ত কিংকর্তব্য বিমুড়।

অবাক। এসব কী হচ্ছে? শফী বিদ্যুৎ গতীতে রিক্সা থেকে নেমে যেতে লাগলো। তখনো এক‘পা মাটিতে আর এক‘পা রিক্সায়। আগন্তুক মোটর বাইকের ড্রাইভার শফীর মাটিছোঁয়া পা’টা ধরে বললো, “প্লিজ ভাই- দোহাই আল্লাহর, আমার খুব বিপদ, আমাকে হেল্প করুন”!! শফী ত পুরোটাই নির্বাক, রিক্সাওয়ালাসহ টাস্কিত! একি করছে লোকটি? প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে গভীরভাবে তাকে পাঠ করতে চাইলো শফী! লোকটি শফীর ভাষা বুঝলো এবং বললো, আমি আপনাকে জানি, মেয়েটি আপনাকে চেনে, এর’চে বেশি বলার সময় আমার হাতে নেই! পরে বিস্তারিত বলবো।

আপনি যেতে যেতে ‘সাওদা আপনার নাম্বার আমাকে পাঠিয়ে দেবে’! কিন্তু (শফীকে থামিয়ে) এখন আর কোন কিন্তু নয়, চলুন, আসুন, সাথে রিক্সা ড্রাইভারকে কানেকানে কি যেনো বললো বাইকওয়ালা লোকটি এবং দ্রুত চলতেও বললো। রিক্সাওয়ালা ছুঁটছে কানেকানে বলা ঠিকানার পথে। এত্তো কিছু ঘটে গেল সর্বোচ্চ পাঁচ-ছয় মিনিটে। এতোক্ষণ মেয়েটি একটি শব্দও উচ্চরণ করেনি।

শফীর বিমুড়তা এখনো পুরোপুরি বিরাজমান। শফী যেন সিনেমার কোন কাহিনি দেখছে। শফী কথা বলতেই ভুলে গেছে। শফীর মাথায় যেন পাহাড় ভেঙ্গে পড়েছে, সে এটা কী করছে? গভীর রাতে একজন মহিলা তার পাশে বসা, শরীয়ত কি এই অনুমতি দিয়েছে? সমাজের লোক এ অবস্থায় শফীকে দেখলে কী ভাববে? মেয়েটির কথায় শফী সম্মতি ফিরে পেলো!

‘প্লিজ আপনার মোবাইল নাম্বারটা!’ শফী কথার উত্তর না দিয়ে মোবাইলটি মহিলার হাতে দিয়ে দিলো, মহিলা দ্রুত একটি নাম্বার ডায়েল করে মিসডকল পাঠিয়ে (ডায়েলকৃত নাম্বারটি ডিলেট করে) মোবাইলটি ফেরত দিলো। এবার শফীর অবস্থা আরেকধাপ খেইহারা! ঠিক তখনই মহিলার মুঠোফোনটি বেঁজে ওঠলো! তিনি মোবাইলটির লাউড বাটনে চাপলেন। আওয়াজ আসছে- “শোনেন, আমাকে আটক করে কোন লাভ হবে না। মেয়েটি কোথায় আছে আমি বলতে পারবো না।

আমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? আপনাদের পরিচয় কি? আমি একজন মুসলিম হিসেবে আমার মুসলিম বোনের ক্ষতি হতে দিতে পারিনা!! শফী কাছে বসা মহিলা ফোনের লাইনটি কেটে দিলেন। শফী রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে মেয়েটিকে প্রশ্ন করলো “ঘটনা কি? ফোন কেটে দিলেন যে? এতো রহস্যময় কেন আজকের রাত? কী হচ্ছে এসব? আমরা কোথায় যাচ্ছি? ভদ্র মহিলা ইংরেজিতে একটু নির্দেশের স্বরে বললেন ‘নো সাউন্ড’?! তারপর পিনপতন নিরবতা। ইতোমধ্যে শফীদের রিক্সা দুইবার চ্যাক করা হয়েছে, মেয়েটি দু’বারই কথা না বলে একটি কার্ড দেখিয়েছে!

শফীর কথার জবাব না দেওয়াতে ভীষণ খারাপ লাগছিল তার। তা হয়তো মহিলা বুঝতে পেরেছিলেন, আকস্মিক শফীকে প্রশ্ন করলেন “ফা ক্বালা ইন্নি সাকিম’র অনুবাদ বা বাংলাটা কি? “অতঃপর তিনি বললেন আমি অসুস্থ”! শফী এ অনুবাদটা শেষ করতেই মেয়েটি মোবাইলে রিং হলো। রিসিভ করলো। ওপারের কণ্ঠটা মেয়েলী, মহিলাকে “নাজিয়া আপা, নো টেনশন, আচ্ছা ঠিকাছে, সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে” বলে লাইনটি কেটে দিল সাওদা নামীয় শফীর পাশে বসা ভদ্রশ্রী।

শফী আরেকবার হোঁচট খেলো, প্রশ্নের জন্য উৎসুখ হয়ে কিছু একটা বলতে চাইছিলো, আচ্ছা বোন!! (শফীকে থামিয়ে) ড্রাইভারকে থামতে বললো মেয়েটি, রিক্সা থেমে গেল। শফী চারপাশটা ভালো করে একবার দেখে নিয়ে বললো এটা ত সেনাবাহিনীর এলাকা, এখানে কেন আসলেন? মেয়েটি এবারো উত্তর না দিয়ে শফীকে বামদিকে থাকাতে বললো।

শফী দেখলো এক অনিন্দ্য সুন্দর বিল্ডিং, যার চৌকাটে লেখা “রেডসান”! শফী বললো এই বিল্ডিং ছাড়া আর কিছু দেখছি না যে? এবার মেয়েটি নিতান্তই নরমকণ্ঠে শফীকে বললো, এটা ‘হোটেল রেডসান’! আল্লাহর পর আমি এই হোটেলে ওঠেছি এই কথাটা আপনিসহ মাত্র দু’জন জানেন, প্লিজ কাউকে বলবেন না।

এমনকি আজকের রাতের এই রহস্য নিয়েও বলালবলি করবেন না। শফী বললো আপনি কি এখানে নিরাপদ? ততোক্ষণে এক পরমা রুপসী নারী এসে শফীদের পাশে দাড়ালো। শফী কিছু একটা বলতে চাইলে সাওদা তাকে তর্জনী দ্বারা চুপ থাকার ইশারা দেয়। শফী তখন চলে আসবে কিনা অথবা কী করবে বুঝতে পারছিলো না।

রেডসান থেকে বেরিয়ে আসা সুন্দরী রিক্সা ড্রাইভারের হাতে ১ হাজার টাকার একটা নোট দিলেন। ড্রাইভার ইতস্তবোধ করছিলো, তখন সাওদা শফীকে দেখিয়ে বললো উনি যেখানে যেতে চান পৌঁছে দেবেন। টাকাটা নিন। একবার রুপসীর দিকে চোখ নিয়ে শফীর দিকে ফেরে সাওদা বললো- লা তাহজান! ইনশাআল্লাহ শীঘ্রই আজকের রহস্য ভেদ হবে!

ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে সবই জানতে পারবেন! আর হ্যা “নুসরাত এলাহী” নামটা একটু মনে রাখবেন! ছামি দ্রুত জানতে চায় চাচ্চু নুসরাত এলাহী অর্থ কি? শফী বললো “আল্লাহর সাহায্য”! ছাদি বলে তারপর চাচ্চু? তারপর ত সাওদারা হারিয়ে গেল ‘হোটেল রেডসানে’।

আর শফী মেঘলা রজনীর সকল রহস্যময় চিন্তা নিয়ে ঝপতে থাকলো ‘নুসারাত এলাহী!! দুনিয়ার জন্য অনেক উন্নত আবাসিক ব্যবস্থা রয়েছে। আর ভাবতেছে ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে এটা আবার কোন রহস্যের ঔষধ?  লেখক:- কলামিস্ট, শিক্ষক ও সম্পাদক- পুষ্পকলি সাহিত্য সংঘ, সিলেট।

 

 

 

(Visited 11 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here