অতিকথন ও আমাদের রাজনীতিবিদগণ

0
280

হাসান হামিদ: শুরুতেই একটি অতিকথনের ঘটনা। টেলিফোন আবিষ্কারক আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের চাকর তার অনুপস্থিতিতে একবার পৃথিবীর প্রথম ফোনে কথা বলার চেষ্টা করেছিলো।

আর তাতে তিনি রেগে গিয়ে তার এক মাসের বেতন কর্তন করেন। তারপর চাকর বেতন কাটার কারণ জানতে চায়। মনিব আমার অপরাধ? তুমি সীমা অতিক্রম করেছ। কিসের সীমা? কথা বলার সীমা। কিন্তু আমাদের দেশের রাজনীতিবিদ আর আমলাদের অতিকথনে সরকার বা দলের অবিভাবক মনে হয় শুনেও না না শোনার ভান করে থাকেন।

সম্প্রতি বাজেট নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের পরও ব্যাংক হিসাবে আবগারি শুল্ক  বাড়ানোর বিষয়ে অনড় অর্থমন্ত্রী। এ কারণে তার উদ্দেশ্যে সংসদে কয়েকদিন আগে ফজলুল করিম সেলিম বলেছেন,  আপনি একগুঁয়েমি সিস্টেম বন্ধ করেন আর কথা কম বলেন।

আসলেই কিন্তু অর্থমন্ত্রীর কিছু কথাবার্তায় সরকারকে অনেকবার  বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে। অথচ এ নিয়ে সমালোচনায় কেউ কেউ গোস্বা করেছেন মনে হয়। আসলে এটা তো শুধু আমদের অর্থমন্ত্রী নয়, তেল মারার রাজনীতির সংস্কৃতি এ দেশে একদিনে হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকে এ দেশে যে যেভাবে পারছে তেল মেরেই যাচ্ছে।

রাজনীতিবিদদের বলতে শুনি, তারা নাকি মুজিব আদর্শে রাজনীতি করেন। কিন্তু আমি তো জানি মুজিব হলো সেই শক্তির নাম, যে কোনোদিন অন্যায়ের সাথে আপোস করেনি। আর সারাজীবন ন্যায্য কথা বলা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকরা আজকাল তেলের পুকুর কেটে বসে আছেন। এসব তেলবাজদের খপ্পরে পড়ে আমাদের বাংলাদেশ কোথায় যাচ্ছে, আমরা একবারও কি ভাবি? তবে ইদানীং রাজনীতিবিদেরা, আমাদের এমপি মন্ত্রীরা যখন জনগণের পক্ষে কিছু বলেন, ভালো লাগে।

সাধুবাদ জানাই যারা নিজেদের সমালোচনা করতে শিখেছেন তাদেরকে। একটা বিষয় কিছুতেই বোঝলাম না। আয়কর হবে আয়ের উপর। সঞ্চয়ের উপর বা লেনদেনের উপর আয়কর কি করে হয়? এত বছর চুপচাপ থেকে এখন সরকারদলীয় সাংসদেরাও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আইন কার্যকরের কঠোর বিরোধিতায় নেমেছেন।  অন্য দলের সাংসদেরাও এ  আইন নিয়ে এত দিন বলিষ্ঠভাবে কোনো কথা বলেননি। অথচ মন্ত্রিসভা ও সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পর জাতীয় সংসদে এই আইন পাস হয় ২০১২ সালের নভেম্বরে।

প্রথম থেকেই একশ্রেণির ব্যবসায়ী ভ্যাট আইনের বিরোধিতা করছিলেন। কিন্তু রাজনীতিবিদেরা কখনোই এর মধ্যে ঢোকেননি। এবারের ছবি কিন্তু আলাদা। জাতীয় সংসদে আজকাল নতুন ভ্যাট আইন ও বাজেট নিয়ে সাংসদেরা মুখর হচ্ছেন। পিছিয়ে নেই জাতীয় পার্টির সংসদেরাও। এমনকি মন্ত্রীরাও সমালোচনা করছেন।

এর মধ্যে এক তেলবাজ সরকারদলীয় সাংসদ আওয়ামী লীগের সাংসদদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘বাজেট নিয়ে আমরাই যদি সমালোচনা করি, বিরোধী দল কেন করবে না। অর্থমন্ত্রীকে কোণঠাসা করতে কথা বলা হচ্ছে। তিনি তো আমার দলেরই মন্ত্রী। তার কোনো ভুল থাকলে প্রধানমন্ত্রীই ঠিক করে দেবেন’। এর নাম রাজনীতি? রাজনীতি মানে শুধু ভোটে জেতা আর দলের লাভ? রাজনীতি মানে জনগণের কিছু নয়?

জনগণ এখন আগের মতো এতোখানি বোকা আছে কিনা তা পরিস্থিতি বলে দেবে। তবে দেশের বড় রাজনীতিবিদদের বলবো, দয়া করে নিজের লাভের কথা ভেবে রাজনীতিকে ব্যবসায় পরিণত করবেন না। কিছুদিন পর আপনারা ইতিহাসে বিকৃত এবং বিক্রিত চরিত্র হবেন। ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখবেন? আর সব রাজনীতিবিদ একই কথা বলে উপরের সাহেবদের তেল মারে।

মনে হয় সব কোর্স করা তেলবাজ। আর নখল করতে সবাই ওস্তাদ। এ বিষয়ে মজার একটি ঘটনা বলি। লেখক প্রেমেন্দ্র মিত্র তখন চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করছেন। তার নতুন একটা ছবি মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু ওই ছবির কাহিনী নিয়ে কথা উঠেছে। বুদ্ধদেব গুহ পত্রিকায় বিবৃতি দিয়েছেন যে, কাহিনীটি তার লেখা। প্রেমেন্দ্র মিত্র নাকি লেখাটি  নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন।

সবাই উদগ্রীব, প্রেমেন্দ্র মিত্র এখন কী বলেন! কিন্তু প্রেমেন্দ্র মিত্র কিছু বলছেন না। কিছুদিন পর প্রেমেন্দ্র মিত্র বিবৃতি দিলেন। তিনি বললেন, ‘চলচ্চিত্রের কাহিনীটি আমার না সেটা সত্যি, তবে বুদ্ধদেব গুহ যেখান থেকে গল্পটি নিয়েছে, আমিও ওই একই জায়গা থেকে নিয়েছি। আমরা জানি, এ দেশের ব্যাংকগুলোকে অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছে।

১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ, এর মধ্যে ঋণ অবলোপনও আছে। কার টাকা অবলোপন করছেন? মানুষের টাকা লুট হচ্ছে, বিদেশে পাচার হচ্ছে। এসব নিয়ে অর্থমন্ত্রীর কোনো বক্তব্য নেই। লুটপাট কারা করছে? এরা কি আপনাদের চেয়ে, সরকারের চেয়ে শক্তিশালী? কেন তাদের আইনের আওতায় আনবেন না? সোনালী, জনতা এসব ব্যাংকের করুণ অবস্থা। হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের সঙ্গে কারা জড়িত, সৎ সাহস থাকলে সংসদে তাদের নাম প্রকাশ করুন।

শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির পর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের প্রতিবেদনে সবই নিজেদের লোকের নাম এল। ব্যবস্থা নিলেন না কেন? আমি অবাক হয়ে কাগজে পড়েছি, ব্যাংকে আমানতকারীদের হিসাবের ওপর আরোপ করা ‘আবগারি শুল্ক’ নামটাই এবার বদলে ফেলার ঘোষণা দিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আমাদের অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ব্যাংক হিসাবে একটা তথাকথিত আবগারি শুল্ক আদায় করা হয়। এর নামটা ঠিক নয়, তা পরিবর্তন হবে।

পত্রিকার খবর অনুযায়ী, সরকার ও আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র বলছে, ব্যাংক হিসাবে বাড়তি আবগারি শুল্ক আরোপের বিষয়টি বাজেটে থাকা উচিত নয় এ বিষয়ে সরকারি দলের নেতারা একমত। বাজেট পাসের সময় এই মতের প্রতিফলন থাকছে, এটাও প্রায় নিশ্চিত। এরপরও সরকারদলীয় সাংসদ ও গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের এভাবে অর্থমন্ত্রীকে লক্ষ্যবস্তু করার পেছনে ভিন্ন কোনো বার্তা আছে কিনা সে প্রশ্নও রয়েছে।

আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারের কোনো মন্ত্রীকে লক্ষ্যবস্তু করা হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা ভালোভাবে নেন না। এর আগে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে সংসদে সমালোচনা শুরু হলে প্রধানমন্ত্রী তাতে হস্তক্ষেপ করেন। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সমালোচনার বিষয়ে হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেনি।

এক বছরে মোটা চালের দাম ৪৭ শতাংশ বেড়েছে। মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। মানুষ চাল কিনতে পারছে না। তিনি বলেন, সুশাসন না থাকলে মানুষ উন্নয়নের সুফল পাবে না। আর বরমান সরকার উন্নয়নের মহাসড়কে নাকি দুর্যোগের মহাসড়কে আছে, সেটা এখন বিবেচনার বিষয়। খবরের কাগজে পড়লাম, আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের ঘোষণা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে।

পুরোনো আইনটিই আরও এক-দুই বছর বহাল রাখা হতে পারে। নতুন আইনটি বহাল রাখা হলেও যেসব ক্ষেত্রে দাম বাড়তে পারে, সেসব পণ্য ও সেবাকে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে। কিন্তু আমার মনে হয়, সরকারের উচিত হয় নতুন আইনটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করুক, না হয় পরাজয় মেনে নিয়ে পুরোনো আইনেই ফিরে যাক।

হ-য-ব-র-ল অবস্থায় নতুন আইন বাস্তবায়ন করার কোনো মানে নেই। আর ইতিমধ্যে সম্পূরক শুল্ক বহাল রাখা এবং ভ্যাটমুক্ত সীমা বাড়িয়ে আইনটি অনেক দুর্বল করা হয়েছে। মূল আইনের দর্শনও নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। তাড়াহুড়ো করে, সমঝোতা করে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করা ঠিক হবে না, যা আমাদের আরও পিছিয়ে দেবে। প্রবল স্রোতের মুখে ভেঙে যাওয়া বাঁধে বালুর বস্তা দেওয়ার কোনো মানে নেই। আর উপরের বাবুরা কথা কম বললেই ভালো হয়; অল্প কথায় কাজ হলে, বেশি কথার দরকার কি? (লেখক- গবেষক ও সদস্য, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র)।

(Visited 9 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here