দুর্নীতির আখড়া, সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার (পর্ব-১)

0
677

সিলেটের সংবাদ ডটকম এক্সক্লুসিভ: “রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলো পথ”- এই বাক্যটি বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রধান ফটকে। কারাগারের কর্তৃপক্ষও দাবি করেছেন, সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রতিটি বন্দিকে রাখা হয় নিবির পর্যবেক্ষণে। কঠোর অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে দেখানো হয় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার পথ।

তবে অনুসন্ধানে বেড়িয়ে এসেছে এর পুরো উল্টো চিত্র। পুরো কারাগার জুড়েই চলছে টাকার খেলা। যার যত বেশি টাকা, সে তত বেশি প্রভাবশালী সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে। টাকাওয়ালারা ঘরের ন্যায় জেলখানাতেও বসবাস করেন আরাম আয়েশে। আর যাদের টাকা নেই তাদের হতে হয় কারা কর্তৃপক্ষের নির্যাতনের শিকার।

তবে কারাগারের বাইরে এসব ঘটনা সহসা প্রকাশ করেন না কেউ। কারণ বেশির ভাগ হাজতি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী বা অপরাধী হওয়ায় তাদের বারবার যেতে হয় কারাগারে। অনুসন্ধানে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, কারাগার কর্তৃপক্ষ সব সময়ই সংবাদকর্মীদের এড়িয়ে চলেন এবং তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করেন।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে কারা ব্যবস্থাপনার ইতিহাস খুজে পাওয়া যায় বহু প্রাচীন কাল হতে। সম্ভবত ১৭৭২ সালে বৃটিশ গর্ভনর জেনারেল ওয়ারেন হেসটিংস্ এই উপমহাদেশে দেওয়ানী ও ফৌজদারী আদালত সৃষ্টির মাধ্যমে কারাগার প্রতিষ্ঠা করেন। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে বাংলাদেশ জেল নামে কারা ব্যাবস্থাপনার অবতারনা হয়। যদিও স্বাধীনতার পরও আজ অব্দী বৃটিশ প্রনীত ১৮৬৪ সালের বেঙ্গল জেল কোড অনুসরন করেই চলছে বাংলাদেশ জেল।

কিন্তু এই বেঙ্গল জেল কোডের আইন মানছেন না খোদ কারা কর্তৃপক্ষ। এ যেন রক্ষক হয়ে গেছেন ভক্ষক। সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে কয়েদি নির্যাতন, অনিয়ম-দুর্নীতি যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। বন্দিদের খাবার, স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ, কারাগারে ভালো স্থানে থাকার ব্যবস্থা, টাকার বিনিময়ে সুস্থ হাজতি ও কয়েদিকে হাসপাতালে রাখা হচ্ছে। টাকার বিনিময়ে ব্যবসায়ী, সোনা চোরাচালানি ও মাদক ব্যবসায়ীরাও কারাগারে বিলাসী জীবনযাপন করছে।

কয়েকটি সুত্র থেকে জানা যায়, সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের ‘আমদানি’ সেল থেকে আসামি বিক্রি করা হয়। কারা কর্তৃপক্ষকে টাকা দিয়ে আসামি কেনে দাগী আসামিরা। মোটামুটি ভালো খাওয়া ও থাকার জন্য মাসে সাড়ে তিন হাজার টাকা ও মাঝারি মানের খাবারের জন্য আড়াই হাজার টাকা দেওয়া হয়। বড়মাপের ব্যবসায়ী, স্বর্ণ চোরাচালানি ও মাদক ব্যবসায়ীরা বিলাসী জীবন যাপনের জন্য কারা হাসপাতালে থাকে। এজন্য জপ্রতি মাসে গুনতে হয় হাজার হাজার টাকা।

তাই সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারকে অনেকেই বলে থাকেন টাকার খনি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কারাগার থেকে তোলা অর্থ উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সব স্তরেই বণ্টন করা হয়। একটি সুত্র জানায়, সিনিয়র জেল সুপার স্বপদে বহাল থাকার জন্য উপর মহলে প্রতি মাসে মোটা অংকের টাকা পাঠান। আর সে কারনে তিনি দিনের পর দিন বহাল তবিয়তে চালিযে যান তার বানিজ্য। অনুসন্ধানে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে অবৈধ আয়ের একাধিক উৎসের সন্ধান পাওয়া গেছে।

কারাগারের ক্যান্টিন ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, কারা হাসপাতালে অসুস্থ হিসেবে বন্দিদের থাকার সুবিধা করে দেয়া আর এর সবকিছুই হয় জেল সুপারের জ্ঞাতসারে। এসবের পাশাপাশি বন্দিদের নিম্নমানের খাবার সরবরাহের সুযোগ দিয়ে ঠিকাদারের কাছ থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়াসহ নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রতি মাসে কোটি টাকার বেশি অবৈধ আয়ের অভিযোগ রয়েছে।

সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে একটি হাসপাতাল রয়েছে। এ হাসপাতালে টাকার বিনিময়ে সুস্থ বন্দিদেরই ‘অসুস্থ’ দেখিয়ে আরামে থাকার সুবিধা দেয়া হয়। হাসপাতাল চিকিৎসকের যোগসাজশে চলে এই সিট বাণিজ্য। মাসের পর মাস নির্দিষ্ট কিছু বন্দিকে হাসপাতালে ভর্তি দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা আদায় করা হয়।

হাসপাতালে ভর্তি বাবদ এককালীন ৫ হাজার টাকা এবং সিট ভাড়া বাবদ মাসে ৪/৫ হাজার টাকা আদায় করা হয়। সিট বাণিজ্য থেকে প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকা অবৈধভাবে আদায় করা হয়। সদ্য কারা ফেরত একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিলেট কারাগারের ভেতরে চলে টাকার খেলা। টাকা দিলেই আরাম-আয়েশে থাকা যায় সেখানে।

টাকা না দিতে পারলে সত্যিকারের অসুস্থ বন্দিও হাসপাতালে সিট পায় না। সুস্থ বন্দিদের দখলেই থাকে হাসপাতালের বেশিরভাগ সিট। অসুস্থরা টাকা না দেয়ায় পড়ে থাকেন ওয়ার্ডের মেঝেতে। হাসপাতালের এই অনিয়মের সঙ্গে খোদ ডাক্তার মিজানুর রহমান জড়িত বলে জেল ফেরৎ কয়েকজন জানান। তিনিই একটি চক্রের মাধ্যমে বন্দিদের পরিবারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে থাকেন।

তবে কারাগার সুত্র থেকে জানা যায়, শুধু মিজান নয় এ বানিজ্যের সাথে জড়িত রয়েছেন আরেকজন তিনি হলেন শফি। কয়েকজন বন্দি জেল থেকে বের হয়ে জানান, জেলের ভিতরে টাকা হলে সব পাওয়া যায়, গাজা, ইয়াবা পাওয়া কোন ব্যাপারই না। তবে টাকা একটু বেশী প্রয়োজন। গাঁজাখোর বন্দিদের মধ্যে গাজা এবং ইয়াবাখোর বন্দিদের মাঝে ইয়াবা বিক্রি হচ্ছে দেদারছে।

এ যেন আরেক অন্ধকার জগত। শুধু কারাগারের কর্তা ব্যাক্তিরাই দেখেন আলোর পথ! সিলেট কারাগারের অনিয়ম ও ব্যবস্থাপনা নজরদারি রাখার জন্য একটি পরিদর্শন টিম আছে। অভিযোগ রয়েছে, নামমাত্র পরিদর্শন হয়, কারাগারের চিত্র বদলায় না। নজরদারি না থাকায় সিলেট কারাগারে নানা অনিয়ম মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এসব যেন দেখার কেউ নেই।

(Visited 44 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here