সুরমা নদীর তীর রক্ষাকারী ডাইক হুমকির মুখে : আতংকে এলাকাবাসী

0
361

সিলেটের সংবাদ ডটকম ডেস্ক: অবৈধ পাথর মজুদ, পরিবহন ও ট্রাক চলাচলের কারণে সিলেটের প্রাণ বলে খ্যাত সুরমা নদীর তীর রক্ষাকারী ডাইক দক্ষিণ সুরমার আলমপুর অংশ হুমকির মুখে পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ডাইক রক্ষায় উদাসীন হওয়ায় এলাকাবাসী আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। যেকোনো সময় ডাইকে ফাটল কিংবা ধ্বস দেখা দিতে পারে এমন আশঙ্কাও রয়েছে।

আর এতে ডাইকের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার ও ডিআইজি অফিস, পাসপোর্ট অফিস, শিক্ষাবোর্ড, জোনাল সেটেলমেন্ট অফিস, পরিবেশ অধিদফতরসহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা। সিলেট সিটি করপোরেশের ২৭ নং ওয়ার্ড এলাকার আলমপুরে সুরমা নদীর ডাইক দখল করে গড়ে ওঠেছে রমরমা অবৈধ পাথরের ব্যবসা।

নদীপথে কানাইঘাটের লোভাছড়াসহ বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত পাথর মজুদ করা হয় বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় সংলগ্ন সুরমা নদীর ডাইকে। আর এ পাথর পরিবহনের জন্য ব্যবহার করা হয় আট চাকার বড় ট্রাক।

সাবেক এম. সাইফুর রহমান শিশুপার্ক (ন্যাচারাল পার্ক) এর সামনের রাস্তা দিয়ে প্রতিনিয়ত ট্রাক চলাচলের কারণে যেমন পার্কের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, তেমনি ধূলায় আচ্ছন্ন এলাকার বাতাসও দূষিত হয়ে পড়ছে। একারণে জনস্বাস্থ্যও হুমকির মুখে পড়ছে। প্রতিনিয়ত পাথর লোড আনলোড ও ক্রাশার মেশিন দিয়ে পাথর ভাঙ্গার কারণে সরকারি অফিসগুলোতে কাজে ব্যাঘাত ঘটছে।

জানা যায়, দক্ষিণ সুরমার ২৭নং ওয়ার্ডের আলমপুর এলাকার বাসিন্দা লিলু মিয়া দীর্ঘদিন ধরে সিলেট বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় ও ডিআইজি অফিস, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড এবং আলমপুর পুলিশ ফাঁড়ি কয়েক গজের ভিতরে চালিয়ে আসছেন এই অবৈধ পাথরের ব্যবসা।

লিলু মিয়া ডাইকে সিলেট গণপূর্ত বিভাগ ও আলমপুর পুলিশ ফাঁড়ির সাথে রফাদফার মাধ্যমে ও সিলেট বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের নাজির নিজাম উদ্দিনের মাধ্যমে এই অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে আসছেন। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দক্ষিণ সুরমার ২৭নং ওয়ার্ডের সুরমা নদীর ডাইকের উপর গণপ্রজান্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাইনবোর্ড ঝুলানো থাকাবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে রমরমা পাথরের ব্যবসা।

এমনভাবে চলছে এই অবৈধ পাথরের ব্যবসা যে কেউ দেখলে মনে হবে না যে এটা সুরমা নদীর তীর, যেন সিলেটের জাফলং, ভোলাগঞ্জ অথবা কানাইঘাটের পাথর কোয়ারি। রয়েছে পাথর ভাঙার ক্রাশার ও পাথরের বড় বড় স্তুপ। চলছে দিনরাত ক্রাশার মেশিনের মাধ্যমে পাথর ভাঙার কাজ।

এখানে কাজ করছেন নারী-পুরুষ শ্রমিকরা। এমকি যে কেউ এই নদী তীরের অবস্থা দেখলে আঁতকে উঠবেন, যেন চেনার কোনো উপায় নেই যে এটি নদীর তীর। এর আগে ২৭নং ওয়ার্ডের কুশিঘাট এলাকায় ২০০০ সালে একটি বালু উত্তোলন কওে ক্ষতিগ্রস্থ করা হয় ডাইকটি। ফলে ২০০৪ সালের বন্যায় এর মাশুল দিতে হয়েছিল ২৭নং ওয়ার্ডবাসীকে।

ওই সময় এই ডাইক ভেঙে সুরমা নদীর পানি ভেতরে ঢুকে পড়লে হবিনন্দী কুশিঘাট, পালপুর, গংগানগর, আলমপুর, গোটাটিকর, পাঠানপাড়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। বন্যায় এলাকার মানুষকে হারাতে হয় অনেক মূল্যবান সম্পদ, এই বন্যার স্মৃতি এখনও ওই এলকার মানুষকে আতংকিত কওে তোলে।

পরে এলাকাবাসীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযানের মাধ্যমে বালু উত্তোলন বন্ধ করা হয়। কিন্তু এবার ব্যবসা পরিবর্ত করে চলছে পাথর মজুদ, ক্রাশার মেশিন ও ট্রাক চলাচল। স্থানীয়রা জানান, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিস রয়েছে এ এলাকায়। এবং সিলেট সিটি করপোরেশনের ২৭নং ওয়ার্ড অফিস পাড়া হিসেবে পরিচিত।

এই এলাকায় রয়েছে সিলেট বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, বিভাগীয় পাসর্পোট অফিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, আলমপুর পুলিশ ফাঁড়ি, করিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও মাদকদ্রব্য অধিদপ্তর সহ বেশ গুরুত্বপূর্ণ অফিস।

এলাকাবাসী প্রশ্ন রেখে বলেন, সিলেট বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয় ও বাসভবন, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, সিলেট মেট্রোপলিটন মোগলাবাজার থানাধীন পুলিশ ফাঁড়ি সীমানায় কি ভাবে লিলু মিয়া প্রকাশ্যে নদীর ডাইকে চালাচ্ছে পাথরের রমরমা ব্যবসা করে।

এমন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আলমপুর পুলিশ ফাঁড়ি থাকা সত্বেও বড় বড় ট্রাক খালি ও পাথর বোঝাই নিয়ে ওই নদীর ডাইকের উপর দিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত এবং দিনে দুপুরে, প্রকাশ্যে। নাম প্রাকাশ না করার শর্তে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড এক কর্মকর্তা বলেন, ভাই কি বলব, বড় বড় ট্রাকের যাতায়াত আর পাথর ক্রাশার মেশিনের শব্দে কাজ করা দুরুহ হয়ে পড়েছে, বড় কষ্টে আছি।

আলমপুর পুলিশ ফাঁড়ি ইনচার্জ শেখ রুবেল বলেন, কে বা কারা এই পাথর ব্যবসা করে তা আমার জানা নেই। তবে আমি দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। ২৭নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল জলিল নজরুল সিলেট বিভাগীয় কমিশনার ও ডিআইজি অফিকে উদৃতি দিয়ে বলেন, ওই এলাকা লোকালয় না থাকায় আমার যাওয়া হয় না।

তিনি বলেন, ওখানে তো বিভাগীয় কার্যালয় ও ডিআইজি অফিস রয়েছে, আমার চেয়ে তাঁরা ক্ষমতাবান। এবং ওই এলাকায় কে বা কারা পাথর ব্যবসা করেন, তা আমার জানা নেই। এ বিষয়ে মোগলাবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, আমি ওই এলাকায় যাইনি এবং কে বা কারা এর সাথে জড়িত, সরজমিনে গিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়টি জানতে চাইলে সিলেট বিভাগীয় কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মৃনাল কান্তি দেব বলেন, আগে আমরা অভিযানের মাধ্যমে উচ্ছেদ করেছি। আবার মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিভাগীয় কমিশনার অফিসের নাজির নিজাম উদ্দিন টাকা লেনদেন অস্বীকার করে বলেন, আমার উপর আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি এ বিষয়ে কোন কিছুই জানি না।

এ বিষয়ে পাথর ব্যবসায়ী লিলু মিয়া দাবি করেন, গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে বন্দোবস্ত নিয়ে এই পাথর ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। বিষয়টি জানতে সিলেট গণপূর্ত বিভাগ সার্কেল-১ মিজানুর রহমান বলেন, আমরা এই জায়গা বন্দোবস্ত দিইনি। এ সম্পর্কে আমরা কিছুই জানিনা। দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সুত্র:- নিউজ মিরর

(Visited 13 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here