বিদায় ২০১৭

0
193

সিলেটের সংবাদ ডটকম ডেস্ক: সূর্য কখন পশ্চিমে ঢলে মশালের মতো ভেঙে/লাল হয়ে উঠে সমুদ্দুরের ভিতরে নিভছে গিয়ে;/সে যে রোজ নেভে সকলেই জানে, তবু/আজো ডুবে যায় সময়মতন সকলের অজানিতে।

শ্যামল বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ তার ‘সূর্য কখন’ কবিতায় এভাবেই সূর্যের বিদায়ের কথা বলেছেন। তার কবিতার মতোই প্রতিদিন চিরচেনা রূপে সূর্য ডুবে যায়।

কিন্তু আজকের সূর্য ডোবা একটু ভিন্ন। আজ গোধূলির পর খ্রিস্টীয় ২০১৭ সালের শেষ সূর্য ডুববে। ঘড়ির কাঁটা রাত ১২টা পেরোলেই গণনা শুরু হবে নতুন খ্রিস্টীয় বছর ২০১৮-এর। ২০১৭ সাল কালের গর্ভে হারিয়ে গিয়েও যেন হারাবে না। কারণ বিদায়ী বছর কেমন গেল, সে স্মৃতির রোমন্থন যেমন হবে, তেমনি সব জরা ক্লান্তিকে মুছে ফেলে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে মেতে উঠবে সবাই।

আজ ২০১৭ সালের শেষ দিন। অনেকেই হিসাব-নিকাশ করবেন, কেমন গেল বছরটি। ব্যক্তিগতভাবে একেকজন একেক মত দিলেও জাতীয় জীবনে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ২০১৭ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নানা ক্ষেত্রে উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে পুরো জাতি।

এসেছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জও। অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও চেষ্টা ছিল এগিয়ে যাওয়ার। পেছনের পুরো বছরের দিকে তাকালে ইতিবাচক ও নেতিবাচক অনেক ঘটনাই সামনে ভেসে উঠবে।

তবে যে ঘটনাটি বাংলাদেশ তথা সারাবিশ্বে এবার আলোচনার শীর্ষে ছিল সেটি হল- মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সে দেশের সরকার কর্তৃক রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং আর এর ফলে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশের আশ্রয় দান।

রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের খবর এসেছিল ২০১৬ সালেও। কিন্তু সেটি গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের ভয়ংকর রূপ ধারণ করে ২০১৭ সালে এসে। জীবন বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে স্রোতের মতো বাংলাদেশে আসতে শুরু করে। প্রথমে প্রবেশে বাধা দেয়া হলেও পরে সীমান্ত খুলে দেয়া হয়।

বাংলাদেশ আগে থেকেই কয়েক লাখ রোহিঙ্গার ভরণপোষণ করে আসছে। বছর শেষে সব মিলে এ সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়েছে বলে জানায় জাতিসংঘ। এ বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার আশ্রয় ও ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয় বাংলাদেশে সরকার। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে পাহাড় কেটে রোহিঙ্গা শিবির করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের আশ্রয় দেয়ায় ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ উপাধি পান। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বারবার বলা হয়, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক এবং তাদের নিজেদের দেশে ফেরত নিতেই হবে। অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের বিষয়টি বারবার অস্বীকার করে আসছিল মিয়ানমার।

কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। জাতিগত নিধনের বিষয়টি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং নিপীড়ন ও গণহত্যার খবর কিছুটা দেরিতে হলেও বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয়। তবে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে এখনও দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি নেই। বরং প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গারা এখনও বাংলাদেশে ছুটে আসছে।

বছরের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়। বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে দিতে সংবিধানে এ সংশোধনী আনা হয়েছিল। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণাকে বহাল রেখে আপিল বিভাগের দেয়া পূর্ণাঙ্গ রায় ১ আগস্ট প্রকাশ হয়।

এ পূর্ণাঙ্গ রায় ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। পর্যবেক্ষণে বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতাসহ কিছু বিষয় নিয়ে যে মন্তব্য করা হয় তাতে ঘোর আপত্তি তোলে আওয়ামী লীগ ও সমমনা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মহল। আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ছুটিতে যান।

এরপর তিনি পদত্যাগ করেন। ২৪ ডিসেম্বর ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) জন্য রাষ্ট্রপক্ষ আবেদন করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর ছিল ২০১৭ সালের অন্যতম আলোচিত বিষয়। ৭ থেকে ১০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করেন।

এ সময় তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিসহ সে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। শেখ হাসিনাকে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে অভূতপূর্ব সম্মান জানানো হয়। এ সফর দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক সম্পর্ককে এক নতুন মাত্রা ও উচ্চতায় নিয়ে যায়।

সফরে দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন চুক্তি এবং সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়। জঙ্গি তৎপরতা দেখা গেছে ২০১৭ সালেও। কিন্তু জঙ্গি দমনে সফলতা দেখিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ৬ মার্চ টঙ্গীতে প্রিজনভ্যানে জঙ্গি হামলা চালিয়ে মুফতি হান্নানকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হয়।

এরপর কুমিল্লার কোর্টবাড়ী, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, সিলেটের দক্ষিণ সুরমা, মৌলভীবাজারের বড়হাট ও নাসিরপুর, ঢাকায় বিমানবন্দরের কাছে আশকোনা, ঝিনাইদহ, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি তৎপরতা ও জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পেয়ে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালায়।

আলোচিত ছিল ২৮ মার্চ ঢাকার বনানীর রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণের ঘটনা। জন্মদিনের পার্টিতে আমন্ত্রণ জানিয়ে ধর্ষণ করার অভিযোগে আপন জুয়েলার্সের একজন মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদ ও তার দুই বন্ধুসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন দুই তরুণী। মামলার এজাহারে বলা হয়, সাফাত ও নাঈম সরাসরি ধর্ষণে অংশ নেয় এবং বাকি তিনজন সহযোগিতা করে।

বর্তমানে মামলাটির বিচার চলছে। বিদায়ী বছর শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে নিজ বাড়িতে ঢুকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটে। ২৯ এপ্রিল গাজীপুরের শ্রীপুরে শিশুকন্যাসহ চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন এক বাবা।

শিশুকন্যা ধর্ষণের শিকার হওয়ার পরও বিচার না পাওয়ায় মেয়েকে নিয়ে চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেন বাবা। এ ঘটনা স্তম্ভিত করে দেয় পুরো জাতিকে। ২০ জুলাই সকালে শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে নীতিমালা প্রণয়নসহ সাত দফা দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাতটি কলেজের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।

এতে বাধা দিলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। একপর্যায়ে পুলিশের ছোড়া টিয়ারগ্যাসের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী সিদ্দিকুর রহমানের দুই চোখ। সিদ্দিকুরকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পরে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

পরে সরকারের পক্ষ থেকে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতের চেন্নাইয়ে নেয়া হয়। কিন্তু দৃষ্টি আর ফিরে পাননি সিদ্দিকুর। স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাকে এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানিতে নিয়োগ দেন। বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল গুমের ঘটনা। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে ২০১৭ সালে এ পর্যন্ত ৫৫ ব্যক্তি গুমের শিকার হয়েছেন।

বরাবরের মতো বছরের শুরুতেই সরকার দক্ষতার সঙ্গে প্রাথমিক ও নিন্মমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই তুলে দিয়ে প্রশংসা কুড়ায়। কিন্তু বইগুলোয় অসংখ্য ভুল ধরা পড়ে। ছাপার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠে। প্রথম শ্রেণীর ‘আমার বাংলা বই’র বর্ণ পরিচয় অংশে ‘ওড়না’ বিতর্ক, পঞ্চম শ্রেণীর ‘আমার বাংলা বই’ এবং ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে বানান ভুলসহ নানা হাস্যকর তথ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলে সমালোচনার ঝড়।

২০১৭ সালের একটি অত্যন্ত আলোচিত ঘটনা হল- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য (ওয়ার্ল্ডস ডকুমেন্টরি হেরিটেজ) হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি। ৩০ অক্টোবর প্যারিসে ইউনেস্কোর হেডকোয়ার্টারে এ স্বীকৃতির ঘোষণা দেন মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা।

খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিসের সফর নিয়ে বিশ্ববাসীর চোখ ছিল বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে। কারণ তিনি এমন একসময় এ দুটি দেশ সফর করছিলেন, যখন রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারে গণহত্যা চালানো হচ্ছিল। শান্তি ও সম্প্রীতির বাণী নিয়ে ৩০ নভেম্বর তিন দিনের সফরে ঢাকায় আসেন পোপ।

ডিসেম্বরের শুরুতে ঢাকায় আসে হংকংয়ের কোম্পানি ‘হ্যান্সন রোবোটিক্সে’র তৈরি করা নারী রোবট ‘সোফিয়া’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ‘সোফিয়া’ ঢাকায় ‘টেক টক উইথ সোফিয়া’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। ২৪ ঘণ্টারও কম সময় ঢাকায় অবস্থান করে এ রোবট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনায় শীর্ষে পৌঁছে যায়।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পদ্মা সেতু প্রকল্প। চলতি বছরের ১ অক্টোবর পদ্মা সেতু নির্মাণের মূল অবকাঠামোর প্রথম স্প্যানটি স্থাপন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে পদ্মা সেতু দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করে তাতে যানবাহন চলাচল শুরু করার টার্গেট নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে সরকার।

বছরের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল বাংলাদেশের পারমাণবিক যুগে প্রবেশ। পাবনার ঈশ্বরদীতে দেশের প্রথম ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের’ মূল নির্মাণকাজ শুরু হয়। এটি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ ও ব্যয়বহুল প্রকল্প। রাশিয়ার অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং দেশটির অর্থায়ন ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে।

প্রকল্পে রাশিয়ার সর্বাধুনিক থ্রি প্লাস জেনারেশনের পরমাণু চুল্লি ব্যবহার করা হবে। ৩০ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পের মূল নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পৃথিবীর পারমাণবিক ক্লাবের ৩২তম সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বিশ্বের সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারক-বাহক দুই বৃহৎ সংগঠন ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ) এবং কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের (সিপিএ) সম্মেলন হয় ঢাকায়।

২ থেকে ৮ অক্টোবর সিপিএ এবং ১ থেকে ৫ এপ্রিল আইপিইউ সম্মেলন হয়। এটি ছিল বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় ঘটনা। বছরের একদম শেষদিকে বাংলাদেশের জন্য আনন্দের খবর নিয়ে আসে অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবল দলের মেয়েরা। ২৪ ডিসেম্বর ঢাকার মাঠে অনূর্ধ্ব-১৫ সাফে বাংলাদেশের মেয়েরা ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়।

সব মিলিয়ে ২০১৭ সাল বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর। সমস্যার সঙ্গে ছিল নানা প্রাপ্তি। সব সমস্যা মোকাবেলা করে এবং প্রাপ্তিগুলোকে সঞ্চয় হিসেবে ধরে শক্তি আর সাহস নিয়ে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ, ২০১৮ বাংলাদেশের জন্য নিয়ে আসবে নতুন সমৃদ্ধি- এ প্রত্যাশা দেশের প্রতিটি মানুষের।

(Visited 9 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here