মার্ডার পয়েন্ট টিলাগড় : আজাদ গ্রুপের হাতে ৩ জনসহ ৮ বছরে ১২ খুন

0
3087

সিলেটের সংবাদ ডটকম এক্সক্লুসিভ: সিলেটের টিলাগড় পয়েন্ট বর্তমানে মার্ডার পয়েন্ট নামে খ্যাত। ছাত্ররাজনীতির জন্য ‘ডেঞ্জার জোন’ হয়ে দাড়িয়েছে সিলেট নগরীর টিলাগড় এলাকা।

চার মাসে টিলাগড়কেন্দ্রীক ছাত্রলীগের গ্রুপিং রাজনীতির বলি হতে হয়েছে তিন জন ছাত্রলীগ কর্মীকে। কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ গ্রুপের অনুসারিদের হাতে বিগত ৪ মাসের মধ্যে ৩জন খুনের ঘটনা ঘটেছে।

খুন হওয়া ছাত্রলীগ কর্মীরা হলেন জাকারিয়া মোহাম্মদ মাসুম, ওমর আহমদ মিয়াদ ও তানিম খান। রোববার (৭ জানুয়ারি) সর্বশেষ এই মৃত্যুর মিছিলে লাশ হন ছাত্রলীগ কর্মী তানিম খান। রাত পৌনে নয়টার দিকে নগরীর টিলাগড় এলাকায় আজাদ গ্রুপের ছাত্রলীগ কর্মীরা তাকে কুপিয়ে হত্যা করে।

এদিকে সিলেটে নিজ দলের হাতে গত ৮ বছরে নিহত হয়েছেন আরো ৯জন। দেশের সবচেয়ে প্রাচীনতম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সিলেটে তার আদর্শ ও গতিপথ হারিয়েছে। ছাত্রসমাজের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের পরিবর্তে এরা নিজেদের নেতা-কর্মীদেরকে হত্যা করছে।

এমনকি চাঁদাবাজি, বাসা-বাড়ি দখল, টেন্ডারবাজি, নারী নির্যাতনসহ হেন কাজ নেই করছেনা। এতে সাধারন ছাত্রসমাজ ছাত্রলীগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বন্ধু ভাবার পরিবর্তে ভয় পায়। একের পর এক ঘটনায় সারাদেশে সমালোচনার শীর্ষে সিলেট ছাত্রলীগ। বিশেষ করে নিজ দলের কর্মীদের হত্যাকান্ডের বিষয় এখন আলাচনার কেন্দ্রবিন্দু।

সিলেটে কতটা বেপরোয়া ছাত্রলীগ? নিচের পরিসংখ্যান থেকে তা সহজেই অনুমাণ করা যেতে পারে। ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত পাওয়া সংবাদপত্রের খবরে এ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এ সংখ্যা আরো বেশি বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা। তারা মনে করেন, অনেক হত্যাকান্ডের পেছনে ছাত্রলীগ নেতাদের ইন্ধন থাকলেও তা প্রকাশ হয়নি। অনেক হত্যাকান্ডে সরাসরি ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা অংশ নিলেও তাদের নামে মামলা হয়নি।

২০১০ সাল থেকে শুরু করে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সিলেট ছাত্রলীগ মেতেছিল খুনের হলি খেলায়। এক এক করে নিজ দলের কর্মীদের হত্যা করে আসছিল। এসব হত্যাকান্ডের জন্য কেন্দ্র থেকে বার বার ছাত্রলীগকে দায়ী করা হলেও হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত মুল হোতাদের আজও আটক বা আইনের আওতায় আনতে পারেনি পুলিশ।

গত ৮ বছরে ছাত্রলীগের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ১২ জন। এর মধ্যে একজন ব্যবসায়ী ছাড়া বাকি সবাই নিজ সংগঠনের নেতাকর্মী। ৮ বছরে ১২টি খুনের ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত কোন হত্যা মামলার বিচার সম্পন্ন হয়নি অথবা খূনিদের আটক করা হয়নি। ফলে এসব হত্যাকান্ডের বিচার নিয়ে নিহতের পরিবার ও সহকর্মীদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

যেভাবে শুরু হয়:- ২০১০ সালের ১২ জুলাই:- সিলেট নগরীর টিলাগড়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে নিজ সংগঠনের ক্যাডারদের ছুরিকাঘাতে খুন হন উদেয়েন্দু সিংহ পলাশ। এমসি কলেজের গণিত বিভাগের ৩য় বর্ষের ছাত্র ও ছাত্রলীগকর্মী ছিলেন উদয়েন্দু সিংহ পলাশ। ২০০৮ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটাই ছিল ছাত্রলীগের হাতে প্রথম প্রাণহানীর ঘটনা।

 উদয়েন্দু সিংহ পলাশ হত্যাকান্ডের ঘটনায় ছাত্রলীগের ৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ১০-১৫ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করেন নিহতের বাবা বীরেশ্বর সিংহ। পরবর্তীতে মূল অভিযুক্তদের বাদ দিয়ে ৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। এই মামলার বিচার আজো শেষ হয়নি।

২০১৪ সালের ৪ জুন:- সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে খুন করা হয় ছাত্রদল নেতা তাওহীদকে। এ ঘটনায় ওসমানী মেডিকেল কলেজের তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতিকে প্রধান আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়।

২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর:- শাহাজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগকর্মী সুমন চন্দ্র দাশ। এ ঘটনায় নিহতের মা প্রতিমা দাস থানায় মামলা দায়ের করেন। প্রায় দুইবছরেও এ হত্যা মামলাটির বিচারকাজ শুরু হয়নি।

২০১৫ সালের ১৫ জুলাই:- সিলেট নগরীর মদিনা মার্কেটে একটি অটোরিকশা স্ট্যান্ড দখল নিয়ে নিজ দলের ক্যাডারদের হামলায় খুন হন ছাত্রলীগ কর্মী আব্দুল্লাহ ওরফে কচি। এ ঘটনায় কচির ভাই আসাদুল হক মামলা দায়ের করলেও আসামীদেরও বেশিরভাগ রয়েছে অধরা।

২০১৫ সালের ১২ আগস্ট:- অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে মদন মোহন কলেজে খুন হন ছাত্রলীগ কর্মী আবদুল আলী। এ ঘটনায় পুলিশ ছাত্রলীগ ক্যাডার প্রণজিৎ দাশ ও আঙ্গুর মিয়াকে গ্রেফতার করে। প্রণজিৎ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এই দুইজন ছাড়া এই হত্যা মামলার অন্য কোন আসামীকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

২০১৬ সালের ২০ জানুয়ারি:- সিলেট সফরে আসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগের দিন নিজ দলের ক্যাডারদের হামলায় নিহত হন সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিবিএ ৪র্থ বর্ষের ছাত্র ও ছাত্রলীগ কর্মী কাজী হাবিবুর রহমান হাবিব।

এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১৪ ছাত্রকে বহিস্কার করে। এদের সবাই ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ও ওই হত্যা মামলার আসামি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিসি ক্যামেরায় হত্যাকারীরা সনাক্ত হলেও এখনো সকল আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

২০১৬ সালের ১ মে:- নগরীর শামীমাবাদে ইসলাম হোসেন নামের এক শ্রমিককে কুপিয়ে খুন করে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা। এ ঘটনায় নিহতের ভাই বাদি হয়ে থানায় মামলা করলেও ছাত্রলীগ ক্যাডাররা ধরা পড়েনি।

২০১৬ সালের ১০ জুলাই:- নগরীর পাঠানটুলায় একটি বাসার দখল নিয়ে ছাত্রলীগ ক্যাডারদের হামলায় খুন হন স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা আব্দুল্লাহ অন্তর। এ ঘটনায় অন্তরের স্ত্রী বাদি হয়ে থানায় মামলা দায়ের করলেও এখনো হত্যাকান্ডের মূলহোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।

২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট:- নগরীর জিন্দাবাজারের এ্যালিগেন্ট শপিং সিটির পার্কিংয়ের সামনে মোটর সাইকেল রাখা নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে জেলা ছাত্রলীগের স্থগিত কমিটির সহ সভাপতি এম. সুলেমান হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে ওই মার্কেটের ব্যবসায়ী করিম বক্স মামুনকে ছুরিকাঘাত করা হয়।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় মামুন ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। এ ঘটনায় পরদিন সুলেমান হোসেন চৌধুরীকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ আজীবনের জন্য বহিস্কার করে। এ খুনের ঘটনায় এখনো সুলেমানকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

২০১৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর:- দুপুরে শিবগঞ্জের লামাপাড়া এলাকায় ছাত্রলীগ কর্মী জাকারিয়া মোহাম্মদ মাসুম ছাত্রলীগ ক্যাডার টিটু বাহিনীর উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে খুন হন। মাসুম ছাত্রলীগের সুরমা গ্রুপের কর্মী ছিলেন। মাসুমের ছোট ভাইকে জিম্মি করে মোবাইল ফোনে ডেকে এনে নিজ দলের ক্যাডাররা তাকে খুন করে।

২০১৭ সালের ১৬ অক্টোবর:- সোমবার বিকালে টিলাগড়  কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদের অফিসের সামনে কয়েক যুবক অতর্কিত হামলা চালায় ওমর মিয়াদের ওপর। এসময় তার বুকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

সর্বশেষ চলতি বছরের ৭ জানুয়ারী:- নগরীর টিলাগড় এলাকায় রাজমহলের সামনে প্রতিপক্ষের ছাত্রলীগ কর্মীদের চুরিকাঘাতে নিহত হন তানিম খান। ছাত্রলীগরে আভ্যন্তরিন কোন্দলে হত্যাকান্ডের ব্যাপারে বিশেষ করে নগরীর টিলাগড় এলাকায় ছাত্রলীগের সন্ত্রাসে অস্থির স্থানীয় বাসিন্দারা।

প্রায়ই নিজেরদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় ছাত্রলীগ কর্মীরা। এ ব্যাপারে সিলেট জেলা ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী জানান, সিলেটে যেসব হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে তাতে দলের ভাবমুর্তি চরমভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে।  এসব হত্যাকান্ডের পেছনে ব্যক্তি স্বার্থই এখানে বড় দেখা যাচ্ছে বলে জানান এসব নেতারা।

তবে এতে দলের ভাবমুর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আমরা এসব ঘটনায় বিব্রতবোধ করছি। ছাত্রলীগের রাজনীতি এখন যেন গতিপথ হারিয়েছে মনে জানান, তবে এর দায় কোনোভাবেই আমরা এড়াতে পারবনা। এজন্য দলের স্থানীয় অভিভাবকমহলকে সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে’।

তা না হলে দল ও সমাজের জন্য এটি অশনিসংকেত বলে মনে করেন এসব নেতারা। অপরদিকে টিলাগড় এলাকার কয়েকজন নাগরিক জানান, শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার সুষ্টু পরিবেশ, ছাত্রসমাজের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করার কথা ছাত্রলীগের। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে তার উল্টোপথে হাটছেঁ ঐতিহ্যবাহি এই সংগঠনটি।

এদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আসামী পলাতক থাকায় গ্রেফতার করা সম্ভব হচ্ছে না। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (মিডিয়া) মুহম্মদ আব্দুল ওয়াহাব বলেন, পুলিশের কাছে অপরাধী অপরাধী বলেই বিবেচ্য হয়।

অপরাধীর কোন দল নেই। তবে অনেক খুনের আসামী পলাতক থাকায় গ্রেফতার করা সম্ভব হচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি। খুনিরা গাঁ ঢাকা দেয়ার কারণে অভিযান দিয়েও গ্রেফতার করা যাচ্ছে না বলেও জানান তিনি।

(Visited 46 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here