মালয়েশিয়ার জাতীয় নির্বাচন বুধবার

0
91

সিলেটের সংবাদ ডটকম ডেস্ক: মালয়েশিয়ার নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা ততই স্পষ্ট হচ্ছে। ৯ মে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে জমে উঠেছে প্রচার-প্রচারণা।

নির্বাচনী যুদ্ধে জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে এগিয়ে আছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ।

দেশটির নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠান মারদেকা সেন্টার জানায়, জনপ্রিয়তার ভোট জরিপে ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ পেয়েছে মাহাথিরের পাকাতান হারাপান জোট।

৪০ দশমিক ৩ শতাংশ ভোটে দ্বিতীয় স্থানে নাজিবের বারিসান ন্যাশনাল। টানা ২২ বছর শাসনের পর ২০০৩ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার হিসেবে পরিচিত মাহাথির মোহাম্মদ। দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ৯২ বছর বয়সে আবারও নির্বাচনী লড়াইয়ে তিনি।

দায়িত্ব নিয়েছেন তার সময়ে বরখাস্ত হওয়া, উপ-প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের জোট পাকাতান হারাপানের। মালয়েশিয়ার ১৪তম জাতীয় নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন তারই সাবেক দল ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের নেতা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে।

বর্ষীয়াণ এ রাজনীতিকের সক্রিয়তায় উচ্ছ্বসিত দেশের সাধারণ জনগণ। বিশ্লেষকরা বলছেন, আসন্ন নির্বাচনে জয়লাভ করা নাজিব রাজাক শিবিরের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ। এদিকে বিরোধী জোটের প্রধানমন্ত্রী মনোনীত মাহাথির মোহাম্মদের সমাবেশগুলোতে অবিশ্বাস্য জনসমাগম।

প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রাজায়ার সমাবেশে স্মরণকালের ব্যাপক জনসমাগমের পর মালাক্কার নির্বাচনী সমাবেশেও রেকর্ড সংখ্যক জনসমাগম হয়েছে। শাসক জোটের নেতা নাজিবকে এ ধরনের বড় জনসমাবেশে বক্তব্য রাখতে দেখা যাচ্ছে না। তবে দুই জোটের শীর্ষ নেতার অনুষ্ঠানের বক্তব্য অনলাইনে লাইভ প্রচার করা হচ্ছে।

অনলাইনে নাজিবের বক্তব্যের শ্রোতার সংখ্যা যেখানে হাজার অতিক্রম করছে না, সেখানে মাহাথিরের বক্তব্য একই সঙ্গে অনলাইনে ৩০/৩৫ হাজার শ্রোতাকে শুনতে দেখা যাচ্ছে। সাবেক অর্থমন্ত্রী দায়েম জয়নুদ্দিন জানান, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী রইস ইয়াতিম এবং সাবেক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমন্ত্রী রাফিদা আজিজ সরাসরি মাহাথিরের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেয়ার পর এই তিন খ্যাতনামা প্রবীণ নেতাকে আমনু থেকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়েছে।

কিন্তু এসব নেতারা আমনুকে বিধি লংঘনের জন্য অবৈধ সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করে বলছেন এই ধরনের বহিষ্কারাদেশে কিছু যায় আসে না। অধিকন্তু আমনুর সমর্থকদের একটি বড় অংশ এবার মাহাথিরের পক্ষে ভোট দেবে বলে উল্লেখ করছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাশেদ আলী বলেন, ‘মাহাথির মোহাম্মদের বাঁধভাঙা জনপ্রিয়তা যদি ভোটে পরিণত হয়, তাহলে নাজিবের বারিসান ন্যাশনাল জোটের জন্য উদ্বেগের কারণ হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মালয়েশীয়দের কাছে মাহাথিরকে অযোগ্য প্রমাণ করার মতো অস্ত্র নাজিবের হাতে নেই বলে আমি মনে করি।

ভোট যুদ্ধে নাজিবের প্রধান অর্জন তার সময়কার বিভিন্ন সঙ্কট দতার সঙ্গে মোকাবেলা করার কৃতিত্ব। এই প্রতিবেদন লেখার সময় রাজধানী কুয়ালালামপুর-পুত্রাজায়াসহ আশপাশের রাজ্যগুলোতে প্রধান দুই জোটের প্রচার প্রচারণা সমানতালে চলছে। দু’পক্ষের কর্মীরা নির্বাচনী সমাবেশে ও ঘরে ঘরে নিজ নিজ দলের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন।

এর মধ্যে গত শনিবার সামরিক বাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা আগাম ভোট দিয়েছেন। ঐতিহ্যগতভাবে এই ভোটের বড় অংশ সরকারি জোটের পক্ষে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নির্বাচন উপলক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও নগদ অর্থ দেয়া হয়েছে।

মূল ইস্যু জিএসটি ও ১ এমডিবি কেলেঙ্কারি:- এবারের বিরোধী জোটের প্রচারণার মূল ইস্যু হলো নাজিব প্রবর্তিত জিএসটি বাতিল এবং ১ এমডিবি দুর্নীতির ইস্যু। অন্যদিকে সরকারি জোটের প্রচারের মূল বিষয় হলো রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা এবং চীনা আধিপত্য রোধ। উভয় পক্ষের প্রচারণার প্রভাব কম বেশি ভোটারদের ওপর পড়ছে।

গত কয়েক বছরের বিরোধী জোট ও মাহাথিরের প্রচার প্রচারণায় প্রধানমন্ত্রী নাজিবকে একজন দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা গেছে বলে মনে হয়। তবে এই প্রচারণা শহুরে মালয়দের যতটা প্রভাবিত করেছে ততটা গ্রামীণ মালয়দের প্রভাবিত করতে পেরেছে বলে মনে হয় না।

তাদের কাছে বিরোধী জোটের মূল আবেদন হিসেবে কাজ করছে ক্ষমতায় যাবার এক শত দিনের মধ্যে জিএসটি বাতিলের বিষয়টি। বিরোধী পক্ষ ক্ষমতায় গেলে চীনা প্রাধান্য সৃষ্টির প্রচারণাও গ্রামীণ মালয়দের কম বেশি প্রভাবিত করছে বলে অনেকের ধারণা।

পাস ফ্যাক্টর ও নিক ওমর:- এক সময়ের বিরোধী জোটের প্রধান শরিক পাস এবার পৃথকভাবে ছোট কয়েকটি সংগঠন নিয়ে জোট করে নির্বাচনে অবতীর্ণ হয়েছে। সংসদের দুই তৃতীয়াংশ আসনে তারা নিজস্ব প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। প্রধান বিরোধী জোটের অভিযোগ নাজিব বিরোধী ভোট বিভাজনের জন্য নাজিব রাজাক বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিয়ে পাসকে আলাদাভাবে নির্বাচন করাচ্ছে।

এই অভিযোগ তারা অস্বীকার করেছে। গত নির্বাচনে পাস ১৪ শতাংশ ভোট এবং ২১ আসনে জয়ী হয়েছিল। বিরোধী জোট থেকে বের হয়ে আসার প্রতিবাদে দলের প্রগ্রেসিভ নেতা হিসেবে পরিচিতরা আমানাহ নামে আলাদা দল করে বিরোধী জোটে যোগ দিয়েছেন। তাদের পক্ষে থাকেন ৭ জন সংসদ সদস্য।

এবারের নির্বাচনে পাসের প্রতিপক্ষ হিসেবে আমানাহ গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। বিরোধী জোট থেকে বের হয়ে আসার ফলে জাতিগত মিশ্র কোন আসনে পাসের জয়ের সম্ভাবনা থাকলো না। অন্যদিকে মালয় প্রধান রাজ্য কেলানতান ও তেরাঙ্গানুতেও পাস বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে পড়েছে।

নতুন কোন রাজ্য দখল তো দূরের কথা বহু বছর ধরে সরকারে থাকা কেলান্তানের ক্ষমতা হারানোর শঙ্কা দেখা দিয়েছে পাসের সামনে। এদিকে বিরোধী পাকাতান হারাপান রাজ্যের অত্যন্ত জনপ্রিয় মুখ্যমন্ত্রী ও পাসের পরলোকগত আধ্যাত্মিত নেতা নিক আবদুল আজিজের জ্যেষ্ঠ পুত্র নিক ওমরকে রাজ্য পরিষদে প্রার্থী করেছে।

পাকাতান জয়লাভ করলে তাকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী করা হতে পারে। এর বাইরে পাসের প্রভাবশালী ৫ নেতার পুত্রকে মনোনয়ন দিয়েছে আমানাহ। পাসের স্বতন্ত্র নির্বাচনে বারিসান লাভবান হলেও দলটি বড় রকমের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আমানাহ নেতারা এও বলছেন যে, পাকাতান জয়ী হলে তারা পাসকে আবার ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করবেন। পাস প্রধান আবদুল হাদি আওয়াংকে তারা ঐক্যের পথে প্রধান বাধা বলে মনে করেন।

নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা:- মালয়েশিয়ায় এবারের নির্বাচনে ‘নির্বাচন কমিশনের’ ভূমিকা সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। এখানে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিবন্ধন করতে হয় সমাজ কল্যাণ দফতরে। কমিটি সংক্রান্ত কিছু তথ্য উপস্থাপন না করার অজুহাতে এই সরকারি প্রতিষ্ঠান মাহাথির মোহাম্মদের দলের নিবন্ধন বাতিল করেছে।

কমিশন ঘোষণা করেছে বিরোধী জোট পাকাতান হারাপান নিবন্ধিত জোট না হওয়ায় এর নামে প্রতীক বরাদ্দ হয়নি। এর প্রার্থীরা জোটের সদস্য সংগঠন পিকেআরের প্রতীক ডাবল চাঁদকে প্রতীক হিসেবে নিয়েছে। এ যুক্তি দেখিয়ে বিরোধী জোটের প্রার্থীর পোস্টারে মাহাথির ও আনোয়ারের ছবি ব্যবহার করা যাবে না বলে ঘোষণা করেছে কমিশন।

অনেক প্রার্থীও পোস্টারে এই দুই নেতার মুখে কালি মেখে দেয়া হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণার জন্য সময় দেয়া হয়েছে ১৩ দিন। আর বলা হয়েছে নির্বাচনী সমাবেশের ১০ দিন আগে সমাবেশের অনুমোদন নিতে হবে। এটি কার্যকর হলে ৪৮ ঘণ্টা আগে প্রচারণা বন্ধ থাকার ফলে একদিনই কেবল নির্বাচনী সমাবেশ করা সম্ভব হতো।

বার কাউন্সিলের সমালোচনার মুখে অবশ্য এই আদেশ প্রত্যাহার করেছে কমিশন। এর আগে শাসক বারিসান জোটের সুবিধার্থে নির্বাচনী আসন পূনর্বিন্যাস করেছে বলে কমিশনের সমালোচনা হয়েছে। নানা ধরনের বিতর্কিত পদক্ষেপ নেবার কারণে কমিশন নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে কি করে তা এখন দেখার বিষয়।

(Visited 4 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here