নগরীর যতরপুরে দেড়শ’ কোটি টাকার ভূমি আত্মসাত করার চেষ্টা

0
306

সিলেটের সংবাদ ডটকম: জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারের প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকার জমি নিজের নামে নেওয়ার অপতৎপরতা শুরু করেছে সিলেট নগরীর যতরপুরস্থ নবপুষ্প  আবাসিক এলাকার সেলুন ব্যবসায়ী মনিন্দ্র রঞ্জন দে।

বৈধভাবে ইজারা নেওয়া এলাকার ১৮ জন লীজ গ্রহীতার উত্তরসুরীদের অর্ধশতাধিক পরিবারের সদস্যদের পক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মুক্তিযোদ্ধা মামুন উদ্দিন চৌধুরী এ তথ্য জানান।

সোমবার বিকালে নগরীর একটি অভিজাত হোটেলে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। মামুন উদ্দিন চৌধুরী বলেন, যতরপুরস্থ মিউনিসিপ্যালিটি মৌজার জে এল নং-৯১ এর ১১১৪৬, ১১১৪৭, ১১১৪৮, ১১১৪৯ ও ১১১৫০সহ ১৩টি দাগে মোট ২ একর ৯৪ শতক ভূমি ১৯৬৮-৬৯ সালে সরকারের নির্বাহী আদেশক্রমে শত্রু সম্পত্তি বা অর্পিত সম্পত্তি হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল।

পরে ১৯৬৮ সাল থেকে ইজারা নিয়ে লেসি হিসাবে এই ভূমিতে  বসোবাস করছেন বর্তমান বাসিন্দারা। ২০১২ সালে সরকার অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পন আইনের গেজেট প্রকাশ করে দেশের সব অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পন বা  অবমুক্তির জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন করেন। এরপর পরই সক্রিয় হয়ে উঠে সিলেটের কুখ্যাত জালিয়াত মনিন্দ্র রঞ্জন দে।

সে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার শর্ষাসুতা গ্রামের সুরেশ চন্দ্র দের পুত্র ও পেশায় সেলুন ব্যবসায়ী। দুটি জাল দলিল সৃষ্টি করে ১১১৪৯ ও ১১১৫০ দাগের ৪৭ শতক জমি তার পৈত্রিক দাবি করে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পন ট্রাইব্যুনালে মোদ্দমা (নং-৩৫০/২০১২) দায়ের করে।

যুগ্ম জেলা জজ ২য় আদালতে দাখিলকৃত তার দুটি দলিল জাল হিসাবে হিসাবে উল্লেখ করে ২০১৭ সালের ৬ জুন অবমুক্তির আবেদন খারিজ করে দেন। সে তখন অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পন আপীল ট্রাইব্যুনালে অর্পিত আপীল মোকদ্দমা (নং ২১১/২০১৭) দায়ের করে।

অপর দিকে মনিন্দ্রর ইন্ধনে একই গেজেটের ১ থেকে ১৪ ও ১৭ থেকে ১৮ নম্বর ক্রমিকের ভূমি অবমুক্তির দাবিতে দেবতার পক্ষে ভূয়া একটি কমিটি গঠন করে ঐ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনোজ কপালী মিন্টু আরেকটি মোকদ্দমা (নং ৩৩৮/২০১২ অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পন ট্রাইব্যুনালে দায়ের করে।

২০১৭ সালের ৬ জুন ঐ মামলার বিচার শেষে আদালত মনোজ কপালী মিন্টুর আবেদন আংশিক মঞ্জুর করে সরকারকে ৮ আনা দেবতার পক্ষে আবেদনকারীকে ৮ আনা হিস্যা দিয়ে রায় প্রদান করেন। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, জেলা প্রশাসক রায়ের বিরুদ্ধে ষোল আনা ডিক্রি পাওয়ার দাবিতে আপীল (নং- ২২৪/২০১৭) দাখিল করেন।

আপীলের রায়ে ২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর অতিরিক্ত জেলা জজ ৪র্থ আদালত সরকারের আপীলটি পরিবর্তন/সংশোধনক্রমে না মঞ্জুর করে দেন। আদালত রায়ে দুটি দাগের  ৪৭ শতক ভূমি জালিয়াত মনিন্দ্র রঞ্জন দে’কে ও বাকী ১১টি দাগের সমুদয় ভূমি দেবতাকে প্রদান করেন।

কিন্তু, একই ট্রাইব্যুনালে জনৈক আব্দুল মতিন গং পক্ষে দায়ের করা অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পন মোকদ্দমা (নং-৩৯৩/২০১২)  ৪৭ শতক ভূমি খরিদা দাবী করে আদালতে কাগজপত্র দাখিল করলেও আব্দুল মতিনের আবেদনটি আদালত খারিজ করে দেন। আব্দুল মতিন গং সংক্ষুব্ধ হয়ে প্রত্যার্পন আপীল ট্রাইব্যুনাল, সিলেটে (নং২৪১/২০১৭) মামলা দায়ের করলে তা তাও খারিজ করে দেন একই বিচারক।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নিম্ন আদালতে মনিন্দ্র রঞ্জন দে’র দাখিলা মোকদ্দমা (নং-৩০৫/২০১২) এর দলিলাদি জাল মর্মে প্রমাণিত হয়। এর বিরুদ্ধে মনিন্দ্র অর্পিত আপীল ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা অর্পিত আপীল মোকদ্দমা (২১১/২০১৭) দায়ের করে। এই মামলায় ২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর অতিরিক্ত জেলা জজ ৪র্থ আদালত রায় প্রদান করেন, যেখানে আদালতও মনিন্দ্রের দাখিলা দলিলাদিকে ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

এর ফলে বিচার বিভাগের সুবিবেচনা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এমনকি, সরকারের নিযুক্ত আইনজীবী ভিপি জিপি এডভোকেট মোহাম্মদ রাজ উদ্দিন তার আপীল শুনানীকালে রহস্যজনকভাবে সরকারের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নালিশা ১৭৮২ নং খতিয়ানের ভূমি দেবোত্তর সম্পত্তি বলে স্বীকার করেন।

আমাদের সন্দেহ, জালিয়াত মনিন্দ্র যোগাযোগী মূলে সরকারের প্রায় দেড় শ’ কোটি টাকার সম্পত্তি এখন বেহাত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়, আপীল ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপীলের সুযোগ না থাকায় সিলেটের জিপির মতামত গ্রহণ করে জেলা প্রশাসক উচ্চ আদালতে রীট আবেদন দাখিলের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

সরকারের সলিসিটর উইং চলতি বছরের ৪ মার্চ সরকারী স্বার্থ রক্ষার্থে রীট আবেদন দাখিলের সুপারিশ এটর্নি জেনারেলের রিট শাখায় পাঠানোর সুপারিশ করা হয়। কিন্তু, এখন পর্যন্ত সরকার পক্ষে এ রীট দাখিল করা হয়নি। অভিযোগকারীরা বলেন, আমরা জানতে পেরেছি যে, কৌশলে বিষয়টি বিলম্বিত করে মনিন্দ্র গং যোগাযোগীমূলে রাষ্ট্রের আইন বিভাগকে বিভ্রান্ত করার জন্য এ রীট না করতে গত ৩ মার্চ একটি পরিপত্র জারি করিয়েছে।

ফলে, সরকারের দেড় শ’ কোটি টাকার সম্পত্তি বেহাত হওয়ার উপক্রম হলেও সিলেটের জেলা প্রশাসক রীট দায়ের করতে পারছেন না। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আইনগত অবস্থান না থাকায় আমরা ইজারা গ্রহীতাগণ নিম্ন আদালতের মোকদ্দাগুলোতে পক্ষভূক্ত হইনি।

কিন্তু, সিলেটের অর্পিত আপীল ট্রাইব্যুনালের রায় বাতিল প্রার্থনায় আমরা লেসিগণ হাইকোর্টে (৪০৬৬/২০১৮) দাখিল করলে বিজ্ঞ হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল জারি করেছেন। অন্যদিকে, আব্দুল মতিন গং অর্পিত আপীল ট্রাইব্যুনালের রায় বাতিলের প্রার্থনা করে হাইকোর্টে আরেকটি রিট (নং- ১১৩/২০১৮) দাখিল করলে হাইকোর্ট বেঞ্চ চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি অর্পিত আপীল ট্রাইব্যুনালের রায় ডিক্রি স্থগিত করে রুল জারি করেন।

কিন্তু, এ তথ্য গোপন রেখে জালিয়াত মনিন্দ্র হাইকোর্ট বিভাগে আরেকটি রিট (নং-১৮৮৬/২০১৮) দাখিল করে তার দাবীকৃত দুটি দাগের ৪৭ শতক ভূমি অবমুক্তির নির্দেশনা হাসিল করতে সক্ষম  হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। এই নির্দেশনার আলোকে সে ঐ দুই দাগের ভূমি নিজ নামের নামজারি করিয়ে নেয়ার পাঁয়তারা শুরু করেছে।

দুটি রিট থাকাবস্থায় তথ্য গোপন করে নামজারির অপচেষ্টার বিষয়টি জানতে পেরে গত ২২ এপ্রিল আব্দুল মতিন নামজারি প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার জন্য জেলা প্রশাসক বরাবরে আবেদন করেছেন। আমরা রীটকারীগণও বিগত গত ৮ মে নামজারি প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার আবেদন জানিয়েছি। কিন্তু, এরপরও মনিন্দ্র ও তার সহযোগিরা নামজারি করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় সম্পদ সিলেটের যতরপুর এলাকার প্রায় দেড় শ’ কোটি টাকার ভূমি জালিয়াত চক্রের কবল থেকে রক্ষার জন্য তারা প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন। হাইকোর্টে দুটি রিট বিচারাধীন অবস্থায় সব ধরনের অবমুক্তি ও নামজারি প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার জন্যও তারা সিলেটের জেলা প্রশাসকের সুদৃষ্টি কামনা করেন।

পাশাপাশি জালিয়াত মনিন্দ্র রঞ্জন দে’র বিরুদ্ধে জালিয়াতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাতের অপচেষ্টার দায়ে অবিলম্বে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন ও পুলিশ প্রশাসনের দৃষ্টিও আকর্ষণ করেন। মামুন উদ্দিন চৌধুরীর পক্ষ থেকে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন যতরপুরস্থ গৌরাঙ্গ মহাপ্রভূ আখড়া কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাতুলেন্দু দত্ত।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মামুন উদ্দিন চৌধুরী, গৌরাঙ্গ আখড়া কমিটির আহবায়ক অরুণ কুমার রায়, সাবেক মন্ত্রী মরহুম সৈয়দ মহসিন আলীর বোন সৈয়দা মহিদুন্নছা খানম, জুয়েল আহমদ চৌধুরী, চৌধুরী আলী আখতারুজ্জামান বাবুল, নারায়ন পুরকায়স্থ ফনি, আব্দুল মতিন, আাব্দুল মানিক, ওহিদ উদ্দিন প্রমুখ।

(Visited 24 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here